
ভারত সরকারের ডাল মিশন ও রাইজোবিয়ামের ভূমিকা
বর্তমানে ভারত সরকার কৃষি খাতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য ‘জাতীয় ডাল মিশন‘ (National Food Security Mission on Pulses)-এর ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ডাল চাষকে একটি লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে ডাল চাষে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সরকার এখন ‘জৈব ও জীবাণু সার’ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। সেই কারণে সরকার কৃষি বিভাগ গুলির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির ডাল বীজ ও সাথে রাইজোবিয়াম জীবাণু সার দিয়ে থাকে।
যেকোনো ফসলে, বিশেষ করে ডাল জাতীয় শস্যে নাইট্রোজেনের প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে রাইজোবিয়াম জীবাণু সার এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল একটি সার নয়, বরং মাটির জীবন্ত বন্ধু। যখন আমরা ইউরিয়ার মতো কৃত্রিম সারের পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করি, তখন এই ক্ষুদ্র অণুজীবটি বাতাস থেকে বিনামূল্যে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে গাছের শিকড়ে পৌঁছে দেয়। ভারত সরকারের বর্তমান কৃষি নীতি অনুযায়ী, মাটির জৈব কার্বন বৃদ্ধি এবং টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে রাইজোবিয়াম জীবাণু সার ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি। আজকের প্রতিবেদনে আমরা এই সারের বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ ও উপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. রাইজোবিয়াম জীবাণু সার কি?
কৃষি বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর আবিষ্কার হলো রাইজোবিয়াম জীবাণু সার। সাধারণ অর্থে, রাইজোবিয়াম বলতে বোঝায় বিভিন্ন জাতের মিথোজীবী জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া যারা মূলত শুঁটি জাতীয় বা ডাল জাতীয় উদ্ভিদের শিকড়ে গুটি বানিয়ে বাস করে। এরা স্বাধীনভাবে দীর্ঘ সময় বাঁচতে বা বংশ বিস্তার করতে পারে না। যে গাছের শিকড়ে গুটি বানায়, সেই গাছের উপর খাদ্য ও জলের [User Instruction Applied] জন্য নির্ভর করে বেঁচে থাকে।
বিনিময়ে এই জীবাণু বাতাসের নাইট্রোজেনকে সরাসরি গ্রহণ করে আশ্রয়দাতা গাছকে সরবরাহ করে। যেহেতু এটি কৃত্রিম ইউরিয়া সারের বিকল্প হিসেবে কাজ করে, তাই একে রাইজোবিয়াম জীবাণু সার বলা হয়।
২. ডাল চাষে রাইজোবিয়াম সারের গুরুত্ব
আমরা গাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদনের জন্য নানা রকম রাসায়নিক সার প্রয়োগ করি। তবে ডাল জাতীয় ফসলে নাইট্রোজেন ঘটিত সারের (যেমন ইউরিয়া) বিকল্প হিসেবে রাইজোবিয়াম জীবাণু সার ব্যবহার করলে খরচ কমে এবং মাটির উর্বরতা বাড়ে।
- সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব: এটি রাসায়নিক সারের তুলনায় অত্যন্ত সস্তা এবং মাটির স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি করে না।
- পরবর্তী ফসলের উপকার: দেখা গেছে, এই সার ব্যবহারের ফলে ডাল শস্য কাটার পর বিঘাপ্রতি প্রায় ৬ কেজি নাইট্রোজেন জমিতে অবশিষ্ট থাকে, যা পরবর্তী ফসলের খাদ্য হিসেবে কাজে লাগে।
আড়ও দেখুন ফসফেট দ্রবণকারী ব্যাক্টেরিয়া (পি.এস.বি) কি ? ফসল উৎপাদনে পি.এস.বি জীবাণু সার এর ব্যবহার
৩. রাইজোবিয়াম জীবাণুর বিভিন্ন জাত ও প্রজাতি
সব ফসলে একই রাইজোবিয়াম জীবাণু সার কাজ করে না। নির্দিষ্ট ফসলের জন্য নির্দিষ্ট প্রজাতি ব্যবহার করতে হয়। নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| ফসল | রাইজোবিয়াম প্রজাতি |
|---|---|
| মটরশুঁটি, মুসুরি, খেসারি | রাইজোবিয়াম লেগুমিনেসিরাম (Rhizobium leguminosarum) |
| সয়াবিন | রাইজোবিয়াম জ্যাপোনিকাম (Rhizobium japonicum) |
| বরবটি, অড়হর, মুগ, ছোলা, বিউলি | রাইজোবিয়াম এসপি (Rhizobium sp.) |
৪. রাইজোবিয়াম জীবাণু সার ব্যবহার করার পদ্ধতি
রাইজোবিয়াম জীবাণু সার মূলত বীজের সাথে মাখিয়ে ব্যবহার করা হয়। তবে সঠিক পদ্ধতিতে দ্রবণ তৈরি না করলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় না। ভাল ফলন পেতে আড়ও কিছু করণীয় আবশ্যক:রাইজোবিয়াম লেগুমিনেসিরাম (Rhizobium leguminosarum)
- ১. পিএইচ (pH) নিয়ন্ত্রণ: অম্ল মাটিতে চুন বা রক ফসফেট ব্যবহার করুন।
- ২. জৈব কার্বন: মাটিতে জৈব সার বা পচা গোবর নিয়মিত দিন, কারণ জৈব কার্বনই এই অণুজীবের শক্তির উৎস।
- ৩. মলিবেডনামের ভূমিকা: রাইজোবিয়ামের কার্যকারিতা বাড়াতে সামান্য পরিমাণে ‘অ্যামোনিয়াম মলিবডেট’ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ক. বীজে মাখানোর পদ্ধতি (Seed Treatment):
- আঁঠালো দ্রবণ তৈরি: প্রথমে ভাতের মাড়ে পরিমাণ মতো জল [User Instruction Applied] মিশিয়ে ১৫ মিনিট ফুটিয়ে নিন। এটি বীজের গায়ে সারটি আটকে থাকতে সাহায্য করে।
- ঠান্ডা করা ও সার মেশানো: দ্রবণটি ঠান্ডা হলে বিঘাপ্রতি ৩৫০ গ্রাম (আপনার ড্রাফটে ৩০০ গ্রাম ছিল, তবে উন্নত মানের জন্য ৩৫০ গ্রাম ব্যবহার করা সঠিক – User Advice) রাইজোবিয়াম মিশিয়ে দিন।
- বীজ শোধন: এই দ্রবণের সাথে বীজগুলো ভালো করে মাখান যাতে প্রতিটি বীজের গায়ে সারের আস্তরণ পড়ে।
- ছায়ায় শুকানো: বীজ বপনের আগে ছায়াযুক্ত জায়গায় শুকিয়ে নিন। রোদে দেবেন না।
খ. চারা গাছে প্রয়োগ পদ্ধতি:
যদি বীজে মাখানো না হয়, তবে নিড়ানি দেওয়ার সময় বিঘাপ্রতি ৩৫০ গ্রাম সার ৮০-১০০ লিটার জলে গুলে গাছের গোড়ায় দেওয়া যায়। এছাড়া পচা গোবর বা কম্পোস্ট সারের সাথে মিশিয়েও প্রয়োগ করা যায়।
৫. ডাল শস্যের উন্নত জাত ও নির্দিষ্ট রাইজোবিয়াম
আপনার ডাল চাষে ভালো ফলন পেতে নিচের জাতগুলো নির্বাচন করতে পারেন:
- ছোলা: ‘এফ ৭৫’, ‘এইচ ৪৫’, ‘আই সি ৭৬’।
- মুসুর: ‘এল ১-৭৭’, ‘এল ২১-৮৩’।
- মুগ: ‘জি এম বি এস ১’, ‘এম ১০’, ‘কে এম ১’।
- অড়হর: ‘আই এইচ পি ১৯৫’, ‘সি সি ১’।
আড়ও দেখুন – আধুনিক রাজমা চাষ পদ্ধতি: অর্থকরী ফসল হিসেবে রাজমা চাষের সম্পূর্ণ গাইডলাইন
৬. রাইজোবিয়াম ব্যবহারে সাবধানতা ও কৃষি সুত্র পরামর্শ
রাইজোবিয়াম ভুল পদ্ধতিতে প্রয়োগ করলে সার নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। নিচে সতর্কতা ও পরামর্শ গুলি ব্যবহারকারীকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে:
- সংরক্ষণ: সতর্কতা: [প্যাকেটটি রোদে রাখা ভুল পদ্ধতি ( রাইজোবিয়াম প্যাকেট রোদ থেকে দূরে ঠান্ডা ও অন্ধকার জায়গায় রাখা সঠিক পদ্ধতি)]।
- সময়সীমা: সতর্কতা: [পুরাতন বা মেয়াদোত্তীর্ণ সার ব্যবহার করা ভুল পদ্ধতি (প্যাকেটের গায়ে লেখা এক্সপায়ারি তারিখ দেখে ব্যবহার করা সঠিক পদ্ধতি)]।
- রাসায়নিকের সংস্পর্শ: সতর্কতা: [কীটনাশক বা রাসায়নিক সারের সাথে রাইজোবিয়াম মেশানো ভুল পদ্ধতি ( রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় জীবাণু মারা যায়। তাই বীজ শোধনের অন্তত ২৪ ঘণ্টা পর অন্য ওষুধ ব্যবহার করা সঠিক পদ্ধতি)]।
- মাটি প্রস্তুতি: সতর্কতা: [শুকনো মাটিতে সার প্রয়োগ করা (ভুল পদ্ধতি; মাটিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে জীবাণু বাঁচবে না। তাই জো অবস্থায় বা হালকা সেচের পর প্রয়োগ করা সঠিক পদ্ধতি)]।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, টেকসই ও লাভজনক কৃষির জন্য রাইজোবিয়াম জীবাণু সার এক অপরিহার্য উপাদান। ভারত সরকারের ডাল চাষের প্রসার ও মাটির উর্বরতা রক্ষার যে মহাপরিকল্পনা, তার সফল বাস্তবায়নে এই অণুজীব সারের বিকল্প নেই। সামান্য সচেতনতা এবং সঠিক পদ্ধতিতে বীজ শোধন করলে আপনি একদিকে যেমন ইউরিয়া সারের খরচ কমাতে পারবেন, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে মাটির প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে পারবেন। তাই আধুনিক ডাল চাষে সফল হতে এবং মাটির জলে ও পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে নিয়মিত উন্নত মানের রাইজোবিয়াম জীবাণু সার ব্যবহার করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: রাইজোবিয়াম জীবাণু সার আসলে কি কাজ করে?
উত্তর: রাইজোবিয়াম হলো এক ধরণের উপকারী ব্যাকটেরিয়া যা ডাল জাতীয় ফসলের শিকড়ে গুটি তৈরি করে। এটি সরাসরি বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে গাছে সরবরাহ করে, ফলে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয় না এবং ফলন বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্ন: সব ফসলেই কি একই রাইজোবিয়াম জীবাণু সার ব্যবহার করা যায়?
উত্তর: না। নির্দিষ্ট ডাল শস্যের জন্য নির্দিষ্ট জাতের রাইজোবিয়াম প্রজাতি ব্যবহার করতে হয়। যেমন, মুসুরি বা মটরের জন্য ‘লেগুমিনেসিরাম’ প্রজাতি, আবার সয়াবিনের জন্য ‘জ্যাপোনিকাম’ প্রজাতি ব্যবহার করা সঠিক।
প্রশ্ন: বীজ শোধনের কতক্ষণ পর বীজ বপন করতে হয়?
উত্তর: রাইজোবিয়াম জীবাণু সার মাখানোর পর বীজগুলো ছায়াযুক্ত স্থানে হালকা শুকিয়ে নিতে হবে। বীজগুলো ঝুরঝুরে হয়ে গেলেই দ্রুত বপন করা উচিত। কোনোভাবেই দীর্ঘসময় ফেলে রাখা বা কড়া রোদে শুকানো যাবে না।
প্রশ্ন: রাসায়নিক সারের সাথে কি রাইজোবিয়াম মেশানো যাবে?
উত্তর: একদমই না। রাসায়নিক সার বা বিষাক্ত কীটনাশকের সংস্পর্শে এলে এই সারের জীবন্ত জীবাণুগুলো মারা যায়। তাই বীজ শোধনের ক্ষেত্রে শুধু জীবাণু সার ব্যবহার করাই সঠিক পদ্ধতি।
প্রশ্ন: অম্ল মাটিতে রাইজোবিয়াম জীবাণু সার ব্যবহারের নিয়ম কি?
উত্তর: মাটি খুব বেশি অম্লীয় হলে এই জীবাণু কাজ করতে পারে না। সেক্ষেত্রে সার প্রয়োগের আগে মাটিতে চুন বা রক ফসফেট ব্যবহার করে মাটির পিএইচ (pH) নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
তথ্য সুত্র
- ১. জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা মিশন (NFSM – Pulses), কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রক, ভারত সরকার। (ডাল চাষের গুরুত্ব এবং সরকারি উদ্যোগের তথ্যের জন্য)।
- ২. কেন্দ্রীয় ডাল গবেষণা ইনস্টিটিউট (ICAR – Indian Institute of Pulses Research, Kanpur)। (রাইজোবিয়ামের প্রজাতি এবং ডাল শস্যের উন্নত জাতের তথ্যের জন্য)।
- ৩. পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি বিভাগ (Department of Agriculture, Govt. of West Bengal)। (বিঘাপ্রতি সারের মাত্রা এবং স্থানীয় চাষ পদ্ধতির নির্দেশিকা)।
- ৪. বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BCKV), মোহনপুর। (রাইজোবিয়াম জীবাণু সার প্রয়োগের বৈজ্ঞানিক ও টেকনিক্যাল পদ্ধতির জন্য)।










