
ভাদ্র ও আশ্বিন মাসের এই সন্ধিক্ষণে বাংলাজুড়ে রবি মরসুমের প্রস্তুতি শুরু হয়। বর্ষার বিদায় এবং শীতের আগমনের এই মধ্যবর্তী সময়ে সঠিক চাষাবাদ করলে কৃষক ভাইদের যেমন লাভজনক আয় হয়, তেমনি বাজারেও তরতাজা সবজির ভালো দাম পাওয়া যায়। উপযুক্ত জমি তৈরি ও পরিচর্যা মেনে চললে সেপ্টেম্বর মাসে সবজি চাষ থেকে দ্বিগুণ লাভ অর্জন করা সম্ভব।
মাটি পরীক্ষা ও জমি প্রস্তুত
যেকোনো চাষ শুরুর প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো মাটি পরীক্ষা।
- মাটির pH ও পুষ্টি মান: মাটির অম্লতা বা ক্ষারত্ব পরীক্ষা করে সার প্রয়োগের মাত্রা ঠিক করা প্রয়োজন।
- জৈব সার প্রয়োগ: রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের দিকে জোর দেওয়া আবশ্যক। শেষ চাষের সময় বিঘা প্রতি পর্যাপ্ত পরিমাণ পচা গোবর, কেঁচো সার বা কম্পোস্ট মেশালে মাটির জল ধারণ ক্ষমতা এবং অণুজীবের সক্রিয়তা বাড়ে।
- মাটি শোধন: মাটিতে থাকা ক্ষতিকারক ফাঙ্গাস বা ব্যাকটেরিয়া মারতে ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি বা সিউডোমোনাস ফ্লুরোসেন্স ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও দেখুন সমন্বিত ফসল চাষ ব্যবস্থাপনা
জল নিকাশি ব্যবস্থা
সেপ্টেম্বর বা ভাদ্র মাসে হঠাৎ ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। তাই জমিতে যেন জল জমে না থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
- মাদুলি বা বেড তৈরি: সবসময় সমতল জমির বদলে উঁচু বেড (Raised Bed) তৈরি করে সবজি চাষ করুন।
- নিকাশি নালা: প্রতি দুটি বেডের মাঝে অন্তত ১ ফুট চওড়া ও গভীর নালা রাখুন, যাতে বৃষ্টির অতিরিক্ত জল দ্রুত জমি থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। জমিতে জল জমলে শিকড় পচে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সেপ্টেম্বর মাসে সবজি চাষ: নাম ও জাতের তালিকা
ভাদ্র মাসে সবজি চাষ তালিকা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই সময়ে মূল ও পাতার সবজি এবং শীতের আগাম সবজি চাষ সবচেয়ে বেশি উপযোগী। নিচে পরিচিত সবজি এবং তাদের ভাদ্র মাসে সবজি চাষের জাত আলোচনা করা হলো:
১. ফুলকপি (আগাম জাত)
- উন্নত জাত: পুসা ক্যাটকি, আগানি, সামার কিং, বরফী।
- দেশি/উপরি জাত: স্থানীয় আগাম দেশি নির্বাচন জাত।
২. বাঁধাকপি
- উন্নত জাত: গ্রিন এক্সপ্রেস, কে কে ক্রস, পুসা ড্রামহেড।
- দেশি জাত: প্রথাগত স্থানীয় জাত।
৩. বেগুন
- উন্নত জাত: মুক্তকেশী, পুসা পার্পল ক্লাস্টার, বি ভি আর-১।
- দেশি জাত: কাঁটাবেগুন, বোলতা বেগুন, কালা বেগুন।
৪. টমেটো
- উন্নত জাত: অর্কা রক্ষক, পুসা রুবি, শক্তিমান, অভিনাশ।
- দেশি জাত: দেশি চেরি টমেটো, দেশি গোল টমেটো।
৫. মূলা
- উন্নত জাত: পুসা চেতকি, পুসা রেশমি, জৌনপুরী।
- দেশি জাত: দেশি পাহাড়ি সাদা মূলা।
৬. লাউ (আগাম ও রবি)
- উন্নত জাত: পুসা নবীন, বরকা, হাইব্রিড লাউ (যেমন: সুফলা, ময়না)।
- দেশি জাত: দেশি লম্বা সাদা লাউ, দেশি গোল হাজারী লাউ।
৭. শসা
- উন্নত জাত: পইনসেট, মালিনী, পুসা সংযোগ, শাইন ডিরেক্ট।
- দেশি জাত: দেশি কচি সবুজ শসা, দেশি কাঁটা শসা।
৮. করলা ও উচ্ছে
- উন্নত জাত: পুসা দো মৌসুমী, পুসা বিশেষ, মেঘনা হাইব্রিড।
- দেশি জাত: দেশি ছোট উচ্ছে, দেশি গীত করলা
৯. মরিচ (লঙ্কা)
- উন্নত জাত: পুসা জওয়ালা, সূর্যমুখী, পন্থ সি-১, বুলেট লঙ্কা।
- দেশি জাত: দেশি ধানি লঙ্কা, দেশি কুঁচো লঙ্কা।
১০. সিম
- উন্নত জাত: পুসা আর্লি সেম, অর্কা জয়, রূপসী।
- দেশi জাত: দেশি নলডোগা সিম, চ্যাপ্টা বেলঘরিয়া সিম।
১১. ওলকপি
- উন্নত জাত: হোয়াইট ভিয়েনা, পার্পল ভিয়েনা।
- দেশি জাত: প্রথাগত স্থানীয় নির্বাচন জাত।
১২. ঢ্যাঁড়শ (নাবিক বা নাবি)
- উন্নত জাত: অর্কা অনামিকা, পুসা এ-৪, পরভানি ক্রান্তি।
- দেশি জাত: দেশি পাঁচশিরা ঢ্যাঁড়শ।
সেপ্টেম্বর মাসে শাক চাষের তালিকা
১. ধনিয়া (ধনেপাতা)
- উন্নত জাত: পুসা চয়ন, সিও-১, অর্কা হরিথা।
- দেশি জাত: দেশি সুগন্ধি ধনে।
২. মেথি শাক
- উন্নত জাত: পুসা আর্লি ব্রাঞ্চিং, কস্তুরী মেথি।
- দেশি জাত: দেশি সাধারণ মেথি।
৩. সরিষা শাক
- উন্নত জাত: পুসা শাক-১, বরুনা।
- দেশi জাত: দেশি রাই শাক।
৪. নোটেশাক / ডাঁটা শাক
- উন্নত জাত: পুসা কির্টি, পুসা লাল চৌলাই।
- দেশি জাত: দেশি সবুজ নোটেশাক।
৫. পালং ও লাল শাক
- উন্নত জাত: অল গ্রিন, পুসা হরিত, অর্কা অনুমা।
- দেশি জাত: দেশি কাটোয়া লাল শাক, দেশি সবুজ শাক।
সেপ্টেম্বর মাসে ফসল চাষ: মাঠ ফসলের তালিকা
সবজির পাশাপাশি সেপ্টেম্বর মাসে ফসল চাষ হিসেবে খাদ্যশস্য ও তৈলবীজ চাষ করা অত্যন্ত লাভজনক।
১. ভুট্টা (রবি)
- উন্নত জাত: এইচ কিউ পি এম-১, শক্তি-১, ডেকাল্ব ৯০০ এম গোল্ড।
- দেশি জাত: দেশি সাদা ভুট্টা, ছোট দানা দেশি ভুট্টা।
২. তোষা পাট (বীজ উৎপাদনের জন্য)
- উন্নত জাত: জে আর ও-৫২৪ (নবীন), জে আর ও-৭৮৩৫।
- দেশি জাত: দেশি সবুজ তোষা পাট।
৩. সরিষা (আগাম)
- উন্নত জাত: পিবিআর-৯১, বরুনা, পীতাম্বরি (হলুদ সরিষা)।
- দেশি জাত: দেশি রাই সরিষা, কালো সরিষা।
৪. মাসকলাই ও মুগ ডাল
- উন্নত জাত: পান্ত-ইউ-১৯, ডব্লিউ বি ইউ-১০৮ (মাসকলাই); সাম্রাট, পুসা বৈশাখী (মুগ)।
- দেশি জাত: দেশি কালো কলাই, দেশি ছোট মুগ।
আগাছা দমন ও পরিবেশবান্ধব পরিচর্যা
ফসলের পুষ্টি ও আলো নিশ্চিত করতে আগাছা মুক্ত রাখা জরুরি।
- যান্ত্রিক ও হাত দিয়ে নিড়ানি: আগাছানাশক রাসায়নিক ব্যবহার না করে বীজ বোনার ১৫-২০ দিন পর প্রথমবার এবং ৩৫-৪০ দিন পর দ্বিতীয়বার হাত দিয়ে নিড়ানি (Weeding) দিন।
- মালচিং (Mulching): খড়, শুকানো পাতা বা প্লাস্টিক মালচিং ব্যবহার করলে আগাছা জন্মায় না এবং মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে।
রাসায়নিক কমিয়ে জৈব ব্যবহারের নির্দেশিকা
মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের জন্য কৃত্রিম কেমিক্যাল কমিয়ে জৈব উপাদানের প্রয়োগ বাড়াতে হবে:
- জৈব সার: রাসায়নিক নাইট্রোজেনের বিকল্প হিসেবে নিম খৈল, সিং গুঁড়ো এবং হাড়ের গুঁড়ো ব্যবহার করুন।
- জীবাণু সার: বীজ শোধনের জন্য অ্যাজোটোব্যাকটর ও পিএসবি (PSB) ব্যবহার করলে রাসায়নিক সারের অপচয় ৩০% কমে।
- জৈব কীটনাশক: পোকা দমনে রাসায়নিক বিষের বদলে নিমাস্ত্র, মেটারহিজিয়াম বা ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস (BT) ব্যবহার করুন।
- ফাঁদ ব্যবহার: ফল ছিদ্রকারী ও শোষক পোকা দমনে হলুদ আঠালো কার্ড (Yellow Sticky Trap) এবং ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করা উচিত।
উপসংহার
সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক কৃষি পদ্ধতি মেনে সেপ্টেম্বর মাসে সবজি চাষ করলে কৃষিকাজ লাভজনক হয়ে ওঠে। মাটির যত্ন, বিষমুক্ত জৈব সারের প্রাধান্য এবং ভাদ্র মাসে সবজি চাষের জাত সঠিকভাবে নির্বাচন করে চাষ শুরু করলে ভালো ফলন অবশ্যম্ভাবী। রাসায়নিক সারের ওপর অতি-নির্ভরতা কমিয়ে মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক পুষ্টি প্রদান নিশ্চিত করুন এবং ভালো উপার্জনের মাধ্যমে নিজের খামারকে সমৃদ্ধ করুন।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. সেপ্টেম্বর মাসে আগাম সবজি চাষের প্রধান সুবিধা কী?
উত্তর: বর্ষা শেষের এই সময়ে আগাম সবজি চাষ করলে শীতের শুরুতেই বাজারে ফসল তোলা যায়, ফলে বাজারের চড়া দাম পেয়ে কৃষক ভাইয়েরা দ্বিগুণ মুনাফা অর্জন করতে পারেন।
২. ভাদ্র-আশ্বিন মাসে চারা পচন ও ড্যাম্পিং অফ রোধে কী করণীয়?
উত্তর: উঁচু বেড (Raised Bed) তৈরি করে জল নিকাশি ব্যবস্থা ভালো রাখতে হবে এবং বীজ বোনার আগে ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি দিয়ে শোধন করে নিতে হবে।
৩. সেপ্টেম্বর মাসে সবজির রোগ-পোকা দমনে জৈব পদ্ধতি কী?
উত্তর: রাসায়নিক বিষের বদলে নিমাস্ত্র, হলুদ আঠালো কার্ড (Yellow Sticky Trap) এবং ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করলে পরিবেশ রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি শোষক ও ফল ছিদ্রকারী পোকা সহজেই দমন করা যায়।
তথ্যসূত্র
- Methods Manual: Soil Testing in India (2011): ভারত সরকারের কৃষি মন্ত্রক।
- ICAR ও BCKV: ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদ ও বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল ক্যালেন্ডার ও সার প্রয়োগ নির্দেশিকা।
- জাত নির্দেশিকা: জাতীয় বীজ নিগম (NSC) ও রাজ্য কৃষি দপ্তরের অনুমোদিত জাত তালিকা।










