
ভূমিকা:
ফাল্গুন ও চৈত্র মাসের এই সন্ধিক্ষণে আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষিতেও আসে ব্যস্ততা। একদিকে শীতের ফসল ঘরে তোলা, অন্যদিকে মার্চ মাসে কি কি সবজি চাষ করা যায় তা নিয়ে চলে গ্রীষ্মকালীন ফসলের প্রস্তুতি। স্মার্ট কৃষকদের জন্য এই সময়ে বৈজ্ঞানিক ও জৈব পদ্ধতির সংমিশ্রণই হলো সফলতার চাবিকাঠি। বিশেষ করে সমন্বিত কৃষিতে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে জৈব বালাইনাশকের সঠিক প্রয়োগ এই সময়ের প্রধান কাজ।
১. ধান চাষের পরামর্শ (বোরো ধান)
মার্চ মাসের কৃষি ক্যালেন্ডার অনুসারে বোরো ধানে এখন থোড় আসা বা দুধ আসার সময়। এই পর্যায়ে রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে।
করণীয়: রোগ ও কীকশত্রুর আক্রমণের প্রতি নজর রাখুন। মাজরা পোকার সাথে অন্যান্য কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে স্পোডোপটেরা এন পি ভি অথবা হেলিকোভালপা এন পি ভি ৫০০ মিলি প্রতি লিটার জলে গুলে স্প্রে করুন। ১০-১২ দিন অন্তর ২-৩ বার।
জৈব সুরক্ষা: মাজরা পোকা, মিলিবাগ ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণে নিম খৈল কাটা প্রতি ২ কেজি মাত্রায় ব্যবহার করা যায় ও ২০ দিন সুরক্ষা দেয়। পোকা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করতে পারেন – নিমতেল, নিমপাতা, নিমখৈল, আতাপাতা, পাটবীজ, তামাকপাতা ইত্যাদি ভেষজ উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশের নির্যাস।
বিশেষ পরামর্শ: আধুনিক পদ্ধতিতে বাড়িতে শুন্য খরচে পোকা দমনে ব্রহ্মাস্ত্র বা নিমাস্ত্র তৈরি করে ব্যবহার করতে পারেন।
২. সরিষা ও ডাল জাতীয় ফসল
ফাল্গুন চৈত্র মাসের সবজি চাষ প্রস্তুতির সাথে শীতকালীন ফসল গুলির শেষ সময়ে নিয়মিত পরিচর্যা গুলি আবশ্যক:
সরিষা: দেরীতে লাগানো সরিষা শুঁটি হলুদ হয়ে শুকোতে আরম্ভ করলে ভোরের দিকে কিংবা বিকেলের দিকে গাছ সমেত কাটুন। নিরোগ সরিষা বীজ আগামী দিনের জন্য সংরক্ষণ করুন। গুদামজাত শস্য বীজ সংরক্ষণে – ছাই, চুন, বালি ইত্যাদি, লঙ্কা, পুদিনা পাতা, তামাক পাতার ব্যবহারও করা যেতে পারে। গুদামজাত শস্য, বীজ সংরক্ষণে – নিমবীজ, নিমপাতার গুঁড়ো, নিম বা সরষের তেল, নিশিিন্দা পাতা ব্যবহার করতে পারেন।
ডাল: মার্চ মাসের কৃষি ক্যালেন্ডারে পোকার আক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। শুঁটি ছিদ্রকারী পোকা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করতে পারেন – নিমতেল, নিমপাতা, নিমখৈল, আতাপাতা, পাটবীজ, তামাকপাতা ইত্যাদি ভেষজ উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশের নির্যাস। ব্যাসিলাস থুরিজেনসিস (বি.টি) ১ গ্রাম প্রতি লিটার জলে গুলে বিকেলের দিকে ৭-১০ দিন অন্তর দুবার স্প্রে করুন। হেলিকোভালপা এন.পি.ভি ব্যবহার করতে পারেন। বীজের গুণমান বজায় রাখতে বীজামৃত দিয়ে শোধন করে রাখা ভালো।
৩. গম, আখ ও পাট চাষ
মার্চ মাসের কৃষি ক্যালেন্ডার অনুসারে আপনার এই মাসে করণীয় কাজ গুলি দেখে নিন:
গম: দেরীতে লাগানো গমে দুধ থেকে দানা বাঁধার সময় হালকা সেচ দিন। গম কাটার উপযোগী হলে দুপুরে বা বিকেলের দিকে গম কাটুন।
আখ: বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে উঁচু জমিতে বসন্তকালীন আখ চাষের প্রস্তুতি নিন। মাটিতে জীবামৃত মিশিয়ে উর্বরতা বাড়াতে পারেন। দেখুন: জীবামৃত তৈরি পদ্ধতি ও কিভাবে মাটিতে কাজ করে।
পাট: বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে পাট চাষের কাজ শুরু করুন। প্রতি কেজি বীজে ৫ গ্রাম সুডোমোনাস ফ্লুরোসেন্স বীজ শোধন ব্যবহার করুন। ২০-২৫ দিন বয়সে চারায় বিঘা প্রতি নিড়ানি দিয়েও চারা বেছে হালকা করে চাপান সার প্রয়োগ করুন। জমি আগাছা মুক্ত রাখুন। ২০ শতাংশ ইউরিয়ার জলীয় দ্রবণ ১৫-২০ দিন অন্তর স্প্রে করলে বাড় ভালো হয়। পোকার আক্রমণ এড়াতে ২ গ্রাম স্পোডোপটেরা এনপিভি বা হেলিকো ভারপা এ পিভি প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করুন।
৪. সবজি চাষের পরামর্শ (ফাল্গুন চৈত্র মাসের সবজি চাষ)
যারা ভাবছেন মার্চ মাসে কি কি সবজি চাষ করা যায়, তাদের জন্য এখন প্রস্তুতির সুবর্ণ সময়।
শীতকালীন সবজি: ফুলকপি, বাঁধাকপি, মার্চ মাসে টমেটো চাষ, পেঁয়াজ, বেগুন, মূলো ইত্যাদি ফসল তোলা হয়ে যাওয়ার কথা।
গ্রীষ্মকালীন সবজি: ফসল তোলার সাথে সাথে মার্চ মাসে সবজি চাষ হিসেবে গ্রীষ্মকালীন কুমড়ো, পুঁই শাক, ঢেঁড়স, শসা, ঝিঙা, করলা, পটল, পাট ও ডাটা শাক ইত্যাদি লাগানোর প্রস্তুতি নিন।
আগাম চাষ: মার্চ মাসে আগাম সবজি চাষ হিসেবে লঙ্কা ও করলার চারা রোপণ করা যায়। রোপণের আগে চারাগুলিকে বীজামৃত মিশ্রিত জলে শোধন করে নিলে রোগের ভয় থাকে না। শূন্য খরচে বাড়িতেই তৈরি করুন বীজামৃত তৈরি পদ্ধতি ও ব্যাবহার জেনে নিয়ে।
আলু চাষ পরামর্শ
ফসল তোলা: আলু গাছের ওপরের অংশ (লতা) মরে গেলে বা কাটার ১০-১৫ দিন পর আলু তুলুন। এতে আলুর খোসা শক্ত হয়।
শোধন ও শুষ্ককরণ: আলু তোলার পর কড়া রোদে না রেখে ছায়াযুক্ত স্থানে শুকিয়ে নিন। পচন রোধে সংরক্ষণের আগে বীজামৃত দিয়ে শোধন করে নিতে পারেন। আলু পরিষ্কার করতে অতিরিক্ত জল ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
৫. ফল চাষ ও আমের মুকুল পরিচর্যা
ফাল্গুন চৈত্র মাসের সবজি চাষ এর সাথে সাথে ফলের বাগানে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। এই সময়ে মূলত আমের মুকুল থেকে গুটি বাঁধার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
করণীয়: বাগান পরিষ্কার করে মালচ দিন। অন্তর্বর্তী ফসল হিসাবে গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজি লাগাতে পারেন। লেবুর ফল মটর দানার মতো আকার হলে সেচের ব্যবস্থা করুন। আমে সেচের ব্যবস্থা করুন।
বিশেষ টিপস: আমে গুটি বাঁধার সময় শোষক পোকা বা অ্যানথ্রাকনোজের আক্রমণ হতে পারে। এর প্রতিকারে জৈব পদ্ধতি হিসেবে নিমাস্ত্র বা অগ্নিঅস্ত্র ২-৩ মিলি প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করুন।
ক. ড্রাগন ফল চাষ পরিচর্যা
মার্চ মাসের শেষে ড্রাগন ফলের গাছে নতুন কুঁড়ি আসতে শুরু করে।
করণীয়: শীতের সুপ্ত দশা কাটিয়ে ড্রাগন গাছে এখন পর্যাপ্ত জৈব সার এবং গোড়ায় পরিমাণমতো জল দেওয়া শুরু করতে হবে। ছত্রাক আক্রমণ রোধে নীমস্ত্র বা হালকা ছত্রাকনাশক স্প্রে করা জরুরি। মালটা বা মোসাম্বি লেবুর গাছে এই মাসে গুটি ঝরা রোধে বিশেষ নজর দিন। সঠিক রোপণ ও পরিচর্যা করতে দেখুন: আধুনিক ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি।
খ. মার্চ মাসে পেঁপে, কলা ও ড্রাগন ফল চাষ:
ফাল্গুন ও চৈত্র মাসের এই সময়ে পেঁপে, কলা এবং ড্রাগন ফল-এর চারা রোপণ করা অত্যন্ত লাভজনক কারণ এই গাছগুলো গরম সহ্য করতে পারে। বিশেষ করে ড্রাগন ফলের কটিং বা চারা লাগানোর জন্য এটিই শ্রেষ্ঠ সময়, কারণ শীতের সুপ্ততা কাটিয়ে গাছ এখন দ্রুত বাড়তে শুরু করে। চারা রোপণের সময় গর্তে পর্যাপ্ত জৈব সার ও হাড়ের গুঁড়ো মিশিয়ে গোড়ায় নিয়মিত জল দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে কড়া রোদে মাটি শুকিয়ে না যায়।
গ. বারোমাসি ফল (আম, কাঁঠাল ও পেয়ারা) রোপণ:
মার্চ মাসে বারোমাসি জাতের আম (যেমন কাটিমন), পেয়ারা (থাই ভ্যারাইটি) এবং বারোমাসি কাঁঠাল (থাই অল টাইম) লাগানোর দারুণ সুযোগ রয়েছে কারণ বর্ষার আগেই গাছগুলো মাটিতে শেকড় ছড়িয়ে থিতু হওয়ার সময় পায়। এই সময়ে চারা লাগালে চৈত্র মাসের প্রখর তাপ থেকে বাঁচাতে গাছের গোড়ায় খড় বা শুকনো পাতা দিয়ে ‘মালচিং‘ করে দিতে হবে এবং নিয়মিত বিরতিতে জল সেচ নিশ্চিত করতে হবে। রোপণের সময় জীবামৃত মিশ্রিত জল ব্যবহার করলে চারার বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় এবং রোগের প্রকোপ কমে। বাড়িতেই শূন্য খরচে জীবামৃত তৈরি করুন লিংকে ক্লিক করে।
ঘ. মার্চ মাসে ফল চারা রোপণ ও পরবর্তী যত্ন:
নতুন রোপণ করা চারা গাছে এই সময়ে নিয়মিত জল দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ চৈত্র মাসের কড়া রোদে মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়। চারা লাগানোর আগে গর্তের মাটিতে মিশিয়ে নিন এবং রোপণের পর মিশ্রিত জল দিয়ে গোড়া ভিজিয়ে দিন। আম ও কাঁঠালের চারার ক্ষেত্রে রোদের তাপ থেকে বাঁচাতে শুরুতে খড় বা কচুরিপানা দিয়ে ‘মালচিং‘ করে দিলে মাটির রস বজায় থাকে।
৬. কন্দ ও মসলা জাতীয় ফসল (বস্তায় আদা চাষ)
আদা, হলুদ, মুখী কচু, ওল লাগানোর সময় এপ্রিল পর্যন্ত চলতে পারে। তবে মার্চ মাস থেকেই জমি বা বস্তা তৈরির কাজ শুরু করা উচিত।
বস্তায় আদা চাষ: যারা জায়গার অভাবে বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করতে চান, তারা এই সময়ে বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। মাটি, বালি এবং পচানো গোবর সার দিয়ে বস্তা পূর্ণ করে আদা রোপণ করুন। বিস্তারিত জানতে দেখুন: বস্তায় আদা চাষের সহজ নিয়ম।
শোধন: আদা ও হলুদের রাইজোম রোপণের আগে বীজামৃত দিয়ে শোধন করলে পচন রোগের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
৩. কিচেন গার্ডেন ও ছাদে চারা তৈরি
পুষ্টিবাগান বা কিচেন গার্ডেন ও ছাদ বাগানে ফাল্গুন চৈত্র মাসের সবজি চাষ তালিকায়:
করণীয়: যারা লঙ্কা, বেগুন বা টমেটোর চারা এই মাসে রোপণ করবেন, তারা রোপণের আগে মাটি জীবামৃত দিয়ে তৈরি করে নিন। চারার গোড়ায় আর্দ্রতা রাখতে কোকোপিট বা মালচিং ব্যবহার করুন। দেখুন বিষমুক্ত ছাদ বাগান করার পদ্ধতি।
৭. কোচবিহারে তামাক চাষীদের জন্য পরামর্শ
মার্চ মাসের কৃষি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলার তামাক চাষীদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
করণীয়: তামাক পাতা ভাঙার কাজ শেষ হয়ে এলে ভালো মানের পাতা বাছাই করে শুকোতে দিন। পোকামাকড়ের উপদ্রব কমাতে ভেষজ নির্যাস বা ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। তামাক কাটার পর জমিতে সবুজ সার হিসেবে ধঞ্চে চাষের পরিকল্পনা করুন।
৮. চা চাষ ও পরিচর্যা
উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলোতে এই সময়ে ফার্স্ট ফ্লাশ বা নতুন পাতা আসার সময়।
সার ও সুরক্ষা: গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে কেঁচো সার বা গোবরে জীবামৃত মিশিয়ে প্রয়োগ করুন। লাল মাকড়সা (Red Spider Mite) দমনে নিমাস্ত্র প্রয়োগ অত্যন্ত কার্যকর।
৯. মৎস্য চাষ
ডিম পোনা (Spawn) ব্যবস্থাপনা: মার্চের প্রখর রোদে ডিম পোনা ছাড়ার আগে হাপ্পা বা নার্সারি পুকুর ভালোভাবে চুন দিয়ে শোধন করে নেওয়া জরুরি যাতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়। পুকুরে প্রাকৃতিক খাবার বা প্লাঙ্কটন তৈরির জন্য মিশ্রিত জল ব্যবহার করলে পোনার বেঁচে থাকার হার অনেক বেড়ে যায়। বিস্তারিত জানতে দেখুন: ডিম পোনা চাষ পদ্ধতি ।
ধানী পোনা (Fry) পরিচর্যা: নার্সারি পুকুরে ধানী পোনা মজুদের পর নিয়মিত প্রোটিন সমৃদ্ধ সম্পূরক খাবার দিন এবং পুকুরের জলের গভীরতা নিয়ন্ত্রণে রাখুন যাতে তাপমাত্রা খুব বেশি না বাড়ে। পোনার দ্রুত বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বা ভেষজ নির্যাস ব্যবহার করা যেতে পারে। আধুনিক গাইড দেখতে ক্লিক করুন: ধানী পোনা চাষ পদ্ধতি।
মাছ চাষ পুকুর প্রস্তুতি : চৈত্র মাসে পুকুর সংস্কার ও চুন প্রয়োগের মাধ্যমে পুকুর প্রস্তুতি শুরু করুন। নতুন পোনা মাছ ছাড়ার আগে জল শোধন আবশ্যক। বিস্তারিত গাইড: আধুনিক মাছ চাষ ও পুকুর ব্যবস্থাপনা।
মাছের রোগ ও প্রতিকার: চৈত্র মাসে পুকুরে জল কমে গেলে মাছের ক্ষত রোগ বা লেজ পচা দেখা দিতে পারে, তাই প্রতিকারে বা ভেষজ নির্যাস জলে মিশিয়ে প্রয়োগ করুন। রোগের প্রকোপ বাড়লে দ্রুত অভিজ্ঞ মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নিন বা দেখুন: মাছের রোগ ও প্রতিকার ।
২. পশুপালন (মুরগি ও গবাদি পশু)
পশুপালন (ছাগল ও গরু): গরম বাড়তে থাকায় ছাগলের পিপিআর (PPR) রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। পশুদের নিয়মিত পরিষ্কার জল পান করান। রোগ ও প্রতিকার জানতে দেখুন: ছাগল পালনের প্রাথমিক চিকিৎসা।
মুরগির যত্ন: এই সময় তাপমাত্রা হঠাৎ বাড়ায় পোল্ট্রি মুরগির ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে। অতিরিক্ত গরমে মুরগির ‘হিট স্ট্রোক‘ হতে পারে। তাই লিটারে জল স্প্রে করা এবং পানীয় জলে ইলেক্ট্রোলাইট বা ভিটামিন-সি মেশানো জরুরি। রানীক্ষেত ও গামবোরো রোগের টিকার জন্য লিঙ্কে ক্লিক করুন: মুরগির রোগ ও ভ্যাকসিন গাইড।
গবাদি পশু: গরুর শরীরে যাতে উকুন বা মাছি না হয়, সেজন্য গোয়ালঘর পরিষ্কার রাখুন এবং অগ্নিঅস্ত্র ছিটিয়ে দিন।
১০. মাশরুম চাষ
মার্চ মাসের কৃষি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই সময়ে ঝিনুক মাশরুম চাষের শেষ সময় এখন তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্যে নিয়মিত জল স্প্রে করুন মেঝে ভেজা রাখুন। এখন মূলত খড় মাশরুম বা মিল্কি মাশরুম চাষের জন্য আদর্শ। মাশরুমের বেড তৈরির সময় আর্দ্রতা বজায় রাখতে নিয়মিত হালকা জলের ছিটে দিন। পদ্ধতি শিখতে ক্লিক করুন: বাড়িতে মিল্কি মাশরুম চাষ পদ্ধতি।
৪. ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন
মার্চ মাসে রোদের তেজ বাড়ায় ভার্মিকম্পোস্টের গর্ত বা রিং-এর আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়।
করণীয়: কেঁচো সার তৈরির জায়গায় নিয়মিত অল্প অল্প জল দিন যাতে কেঁচো গরমে মারা না যায়। কেঁচো সারের গুণমান ও তৈরির পদ্ধতি দেখতে দেখুন: সহজ উপায়ে কেঁচো সার তৈরি।
৫. মৌমাছি পালন (Beekeeping)
যেহেতু আম, লিচু ও সর্ষের ফুল এখন চারপাশেই থাকে, তাই মৌমাছি পালকদের জন্য এটি মধুর মধু আহরণের সময়।
করণীয়: বাক্সগুলো পরিষ্কার রাখা এবং বক্সের চারপাশে পিঁপড়ে বা পরজীবী তাড়াতে ব্যবস্থা নিন।
১১. মার্কেটিং ও জৈব সার্টিফিকেশন
আপনার উৎপাদিত জৈব ফসলকে সঠিক দামে বাজারে পৌঁছে দিতে মার্চ মাসের কৃষি ক্যালেন্ডার মার্কেটিং পরিকল্পনা করুন।
- পরামর্শ: মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সরাসরি গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করুন।
- উৎপাদক গোষ্ঠী: উৎপাদিত কাঁচা পণ্য সরাসরি সঠিক মূল্যে যে কোনও বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে ও পণ্য মূল্য সংযোজন এর জন্যে FPO/FPC তৈরি করুন বা আপনার কাছাকাছি থাকলে শেয়ার দিয়ে যুক্ত হন বা SHG তে যুক্ত থাকলে আনন্দধারা প্রডিউসার গ্রুপ (PG ) গঠন করুন [ PG গঠন পদ্ধতি জানতে এখানে ক্লিক করুন]
আলু বিক্রি
- বাছাইকরণ (Grading): আকার অনুযায়ী আলু আলাদা করে গ্রেডিং করুন। বড় ও দাগহীন আলুর জন্য বাজারে আলাদা দাম নিশ্চিত করুন।
- চটের বস্তা: দীর্ঘক্ষণ সতেজ রাখতে প্লাস্টিকের বদলে চটের বস্তা ব্যবহার করুন।
- সরাসরি বিক্রয়: বিষমুক্ত বা জৈব আলু হিসেবে অনলাইনে বা সরাসরি আবাসন এলাকাগুলোতে বিক্রির চেষ্টা করুন, এতে লাভ বেশি হয়।
- সার্টিফিকেশন: জৈব কৃষি পণ্যের সঠিক মূল্য পেতে জৈব সার্টিফিকেশন পদ্ধতি অত্যন্ত জরুরি। কিভাবে আবেদন করবেন তা জানতে দেখুন: জৈব সার্টিফিকেশন গাইডলাইন।
উপসংহার:
ফাল্গুন চৈত্র মাসের সবজি চাষ ও সঠিক পরিকল্পনা আপনার সারা বছরের কৃষিকাজকে সহজ করে দেয়। রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে জীবামৃত বা নিমাস্ত্রর মতো জৈব উপকরণ ব্যবহারে মাটির উর্বরতা ও ফসলের গুণমান দুই-ই বৃদ্ধি পায় এবং চাষের খরচ কমে আসে । মনে রাখবেন, সুস্থ মাটিই সুস্থ ফসলের ভিত্তি ও চাষে কম খরচই হবে আপনার লাভের একটি বড় পুজি ।
কৃষি সুত্র পরামর্শ: কৃষি বিষয়ে যেকোন সমস্যা সমাধানের জন্যে নিকটবর্তী ব্লক কৃষি বিভাগ বা কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। এছাড়াও যদি আপনি বাড়িতে বসেই ভারত সরকার কৃষি বিভাগের বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলতে চান তবে আপনি সকল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত টোল ফ্রী নম্বরে ফোন করে নিজ ভাষাতে কথা বলেই আপনার সমস্যা সহজেই সমাধান করতে পারেন।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন. ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বা মার্চ মাসে কি কি সবজি চাষ করা যায় বা সবচেয়ে লাভজনক?
উত্তর: এই সময়ে আগাম গ্রীষ্মকালীন সবজি হিসেবে ঝিঙে, করলা, পটল, ঢেঁড়স এবং শসা চাষ করা সবচেয়ে লাভজনক। কারণ এই ফসলগুলো যখন বাজারে আসবে তখন বাজারে সবজির টান থাকে এবং ভালো দাম পাওয়া যায়।
২. আমের গুটি ঝরা বন্ধ করতে এই মাসে কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?
উত্তর: আমের গুটি যখন মটর দানার মতো হয়, তখন মাটির আর্দ্রতা বুঝে হালকা জল সেচ দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া শোষক পোকা দমনে জৈব উপায়ে তৈরি নিমাস্ত্র বা ভেষজ নির্যাস স্প্রে করলে গুটি ঝরা অনেকাংশে কমে যায়।
৩. গরমে সবজি গাছে কতবার জল দেওয়া প্রয়োজন?
উত্তর: মাটি শুকিয়ে যাওয়ার আগেই গাছে জল দিতে হবে। সাধারণত খুব ভোরে অথবা বিকেলের দিকে জল দেওয়া সবচেয়ে ভালো। কড়া রোদে দুপুরে কখনোই গাছে জল দেবেন না, এতে গাছের ক্ষতি হতে পারে।
৪. বস্তায় আদা চাষ করার জন্য মার্চ মাস কি সঠিক সময়?
উত্তর: হ্যাঁ, মার্চ বা ফাল্গুন মাসের শেষ দিক থেকেই বস্তায় আদা চাষের প্রস্তুতি শুরু করা যায়। আদা ও হলুদ রোপণের আগে বীজামৃত দিয়ে শোধন করে নিলে চারা পচা রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
৫. বোরো ধানে মাজরা পোকা দমনে কী ধরণের জৈব ঔষধ ব্যবহার করা যায়?
উত্তর: বোরো ধানের মাজরা পোকা নিয়ন্ত্রণে নিম তেল বা ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহার করা অত্যন্ত কার্যকর। প্রতি লিটার জলে ২-৩ মিলি মিশিয়ে ১০-১২ দিন অন্তর স্প্রে করলে পোকা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
তথ্য সুত্র
- ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান কেন্দ্র (ICAR)
- বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BCKV)
- মৎস ও প্রাণী ও উদ্যানপালন বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকার ।









![বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি: ১টি বস্তায় ৩ কেজি আদা পাওয়ার ৭টি গোপন কৌশল [২০২৬ আপডেট] বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি ও মাটি তৈরির সঠিক নিয়ম - ১টি বস্তায় ৩ কেজি ফলন](https://krishisutra.com/wp-content/uploads/2026/02/bostay-ada-chash-podhati-krishi-sutra-300x169.webp)
