প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি (PM-KISAN) সম্পূর্ণ গাইডলাইন ও আবেদন নিয়ম

PM কিষাণ যোজনা: নতুন আবেদন পদ্ধতি , ষ্টাটাস চেক, পরের কিস্তির টাকা, PM kisan scheme
পিএম কিষাণ প্রকল্প নতুন আবেদন পদ্ধতি ও ষ্টাটাস চেক।

ভারত সরকারের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় কৃষক কল্যাণমূলক উদ্যোগ হলো PM কিষাণ যোজনা (প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি প্রকল্প)। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের কোটি কোটি প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। তবে অনেক কৃষকই জানেন না যে এই পিএম কিষান যোজনা-র অনলাইন স্ট্যাটাস কীভাবে চেক করতে হয়, নতুন আবেদন কিভাবে করতে হয় এবং কি কি ডকুমেন্ট লাগে? নিচে PM-KISAN স্কিম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আলোচনা হয়েছে।

১. PM কিষাণ যোজনার মূল উদ্দেশ্য

PM-KISAN প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো কৃষকদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলা। এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলি নিচে দেওয়া হলো:

  • সরাসরি আর্থিক সাহায্য: কোনো দালাল বা মধ্যভোগী ছাড়াই সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরকারি অনুদান পৌঁছে দেওয়া।
  • চাষের প্রাথমিক খরচ মেটানো: মরসুমের শুরুতে (যেমন বীজ বোনা বা জমি তৈরির সময়) কৃষকদের হাতে নগদ টাকার জোগান দেওয়া।
  • ঋণের হাত থেকে মুক্তি: গ্রামীণ এলাকার ছোট কৃষকদের চড়া সুদের ধার-দেনা থেকে দূরে রাখা।

আড়ও দেখুন কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (KCC) ঋণ: KCC ঋণ সুবিধা, লিমিট ও আবেদন পদ্ধতি

২. PM কিষান প্রকল্পের আর্থিক সুবিধা ও কিস্তির নিয়ম

PM কিষাণ যোজনার অধীনে যোগ্য কৃষকদের বছরে মোট ৬,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। তবে এই টাকা একবারে দেওয়া হয় না, সম্পূর্ণ টাকাটি নিচে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হয়:

  • কিস্তির পরিমাণ: বছরে মোট ৩টি কিস্তিতে ২,০০০ টাকা করে সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়।
  • সময়সীমা: প্রতি ৪ মাস পর পর (বছরে তিনবার) এই কিস্তির টাকা রিলিজ করা হয়।
  • টাকা পাওয়ার মাধ্যম: এটি সম্পূর্ণভাবে ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT)-এর মাধ্যমে পাঠানো হয়, যার ফলে টাকার কোনো অপচয় বা জালিয়াতি হয় না।

৩. আবেদনের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও শর্তাবলী

ভারতের এবং বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো প্রকৃত কৃষক এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারেন, যদি তাঁরা নিচে দেওয়া শর্তগুলি পূরণ করেন:

  • জমির মালিকানা: আবেদনকারী কৃষকের নিজস্ব নামে চাষের যোগ্য জমি বা খতিয়ান (RoR) থাকতে হবে। জমির পরিমাণ ছোট বা বড় যাই হোক না কেন, তিনি আবেদন করতে পারবেন।
  • পরিবারের সংজ্ঞা: এই যোজনার নিয়ম অনুযায়ী একটি কৃষক পরিবার বলতে স্বামী, স্ত্রী এবং তাঁদের নাবালক সন্তানদের বোঝায়।
  • ভৌগোলিক অবস্থান: আবেদনকারীকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট রাজ্যের (এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ) স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।

৪. কারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না?

অনেক সময় চাষের জমি থাকা সত্ত্বেও কিছু নিয়মের কারণে কৃষকেরা পিএম কিষান প্রকল্প সুবিধা থেকে বাদ পড়তে পারেন। কেন্দ্রের নিয়ম অনুযায়ী নিচে দেওয়া ব্যক্তিরা এই যোজনার সুবিধা পাবেন না:

  • প্রাতিষ্ঠানিক জমির মালিক: যদি জমিটি কোনো সংস্থা, ট্রাস্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক খতিয়ানের অধীনে থাকে।
  • চাকুরীরত বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা: কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের যেকোনো দপ্তরের কর্মী, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সংস্থার কর্মচারী (চতুর্থ শ্রেণী বা গ্রুপ-ডি কর্মী ছাড়া)।
  • সাংবিধানিক পদাধিকারী: বর্তমান বা প্রাক্তন মন্ত্রী, সাংসদ (MP), বিধায়ক (MLA) বা জেলা পরিষদের মেয়র/চেয়ারম্যান।
  • উচ্চ অর্থনৈতিক পদমর্যাদা: গত অর্থবর্ষে যাঁরা আয়কর (Income Tax) জমা দিয়েছেন বা যাঁদের প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকার বেশি পেনশন আসে।
  • পেশাদার ব্যক্তি: নিবন্ধিত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CA) এবং আর্কিটেক্ট।

আড়ও দেখুন FPO কি ? FPO গঠন ও কার্যাবলী গাইড: কৃষক উৎপাদক সংস্থা রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি

৫. PM কিষান আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র

PM কিষাণ যোজনা আবেদন করার আগে নিজের কাছে নিচে দেওয়া তথ্য ও কাগজপত্রগুলি প্রস্তুত রাখা আবশ্যক:

  • ১. পরিচয়পত্র: আবেদনকারী কৃষকের আধার কার্ড। (মনে রাখবেন, আধার কার্ডের সাথে মোবাইল নম্বর লিঙ্কড থাকা জরুরি)।
  • ২. জমির সাম্প্রতিক রেকর্ড: চাষের জমির নিজস্ব খতিয়ান বা পর্চা (Land Mutation/RoR Copy)। যেখানে কৃষকের নাম স্পষ্ট থাকতে হবে।
  • ৩. ব্যাংক পাসবই: কৃষকের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ। অ্যাকাউন্টটি অবশ্যই আধার লিঙ্কড (Aadhaar Seeded) এবং DBT (Direct Benefit Transfer) চালু করা থাকতে হবে, নতুবা টাকা ঢুকবে না।
  • ৪. সচল মোবাইল নম্বর: আবেদন ও ওটিপি (OTP) ভেরিফিকেশনের জন্য একটি স্থায়ী মোবাইল নম্বর।

৬. পিএম কিষান নতুন আবেদন করার পদ্ধতি

বর্তমানে সরকার পিএম কিষান প্রকল্প অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ও তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে। আপনি দুইভাবে আবেদন করতে পারেন:

ক) অনলাইন পদ্ধতি

  • ১. প্রথমে পিএম কিষাণের অফিশিয়াল পোর্টাল pmkisan.gov.in-এ যান।
  • ২. হোম পেজে থাকা ‘New Farmer Registration’ অপশনে ক্লিক করুন।
  • ৩. আপনার আধার নম্বর ও মোবাইল নম্বর দিয়ে ওটিপি (OTP) ভেরিফাই করুন।
  • ৪. এরপর আপনার রাজ্য, জেলা, ব্লক এবং গ্রামের নাম সিলেক্ট করে ব্যক্তিগত তথ্য ও জমির খতিয়ান নম্বর নির্ভুলভাবে আপলোড করুন এবং ফর্মটি সাবমিট করুন।

খ) অফলাইন পদ্ধতি (CSC Center):

আপনার নিজস্ব এলাকায় থাকা নিকটবর্তী তথ্য মিত্র কেন্দ্র (CSC – Common Service Centre)-এ গিয়ে সমস্ত নথিপত্র দিলে ডিজিটাল সহায়ক অত্যন্ত কম খরচে আপনার আবেদনটি অনলাইনে সাবমিট করে দেবেন।

৭. ই-কেওয়াইসি (e-KYC) এবং ল্যান্ড সিডিং (Land Seeding) কী?

অনেকেই নতুন আবেদন করার পরেও টাকা পান না, কারণ তাঁদের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভেরিফিকেশন বাকি থাকে। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার রানিং থাকায় এখন এই ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া আরও কড়াকড়ি ও অনলাইন মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে:

আধার ই-কেওয়াইসি (e-KYC): এটি হলো কৃষকের পরিচয় যাচাই করণের পদ্ধতি। এটি না করলে পিএম কিষাণের টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকবে না। আপনি পিএম কিষাণ পোর্টালে গিয়ে নিজের আধার নম্বর দিয়ে ওটিপি (OTP)-র মাধ্যমে অথবা তথ্য মিত্র কেন্দ্রে (CSC) গিয়ে বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) দিয়ে এই ই-কেওয়াইসি করে নিতে পারেন।

ল্যান্ড সিডিং : এর অর্থ হলো আপনার জমা দেওয়া জমির খতিয়ান বা পর্চাটি সরকারি ভূমি দপ্তরের (Land Records) ডেটাবেসের সাথে লিঙ্ক করা। আপনার ব্লক কৃষি অফিস থেকে এই ল্যান্ড সিডিং ভেরিফিকেশন করা হয়। পোর্টালে ল্যান্ড সিডিং-এর পাশে ‘YES’ লেখা থাকা বাধ্যতামূলক।

৮. পিএম কিষান স্ট্যাটাস চেক করার নিয়ম

আপনার আবেদনটি কোন অবস্থায় আছে বা আপনার অ্যাকাউন্টে কিস্তির টাকা ঢুকেছে কিনা, তা আপনি নিজেই মোবাইল থেকে চেক করতে পারবেন:

কীভাবে চেক করবেন (সহজ পদ্ধতি):

  • ১. ওপরের লিংকটিতে ক্লিক করলে সরাসরি ‘Beneficiary Status’ পেজটি খুলে যাবে।
  • ২. সেখানে আপনার Registration Number (রেজিস্ট্রেশন নম্বর) লিখুন।
  • ৩. স্ক্রিনে দেখানো ক্যাপচা কোডটি (Captcha Code) নির্দিষ্ট বক্সে সঠিকভাবে বসান।
  • ৪. এরপর ‘Get Data’ বা ‘Get OTP’ বোতামে ক্লিক করলেই আপনার অ্যাকাউন্টের বর্তমান স্ট্যাটাস এবং কিস্তির টাকা ঢোকার সব বিবরণ দেখতে পাবেন।

(নোট: আপনার কাছে যদি রেজিস্ট্রেশন নম্বর না থাকে, তবে ওই পেজের ডানদিকের ওপরে থাকা ‘Know Your Registration Number’ লিংকে ক্লিক করে আপনার নথিভুক্ত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সহজেই সেটি বের করে নিতে পারবেন।)

২. পিএম কিষান পরের কিস্তির টাকা কবে ঢুকবে

সরকার পরবর্তী কিস্তির টাকা কবে রিলিজ করবে, তার অফিসিয়াল লাইভ কাউন্টডাউন এবং তারিখ সাধারণত মেইন হোমপেজে বড় করে দেওয়া হয়। মোবাইলে সহজে দেখার জন্য নিচে লিংক বটম এ ক্লিক করুন।

কীভাবে দেখবেন: পোর্টালের হোমপেজটি খুললেই একদম ওপরের দিকে স্ক্রোলিং টেক্সট বা ব্যানারে দেখতে পাবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরবর্তী কিস্তির টাকা কোন তারিখে রিলিজ করবেন।

৯. টাকা না পেলে বা কোনো সমস্যা হলে কোথায় যোগাযোগ করবেন?

যদি আপনার স্ট্যাটাসে কোনো ভুল দেখায়, টাকা আটকে যায় বা আধার ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হয়, তবে সমাধানের জন্য নিচে দেওয়া মাধ্যমগুলি ব্যবহার করুন:

  • ১. পিএম কিষাণ হেল্পলাইন নম্বর: যেকোনো জিজ্ঞাসার জন্য কেন্দ্রের টোল-ফ্রি নম্বর 155261 অথবা 1800115526-এ ফোন করতে পারেন।
  • ২. অনলাইন গ্রিভেন্স: পোর্টালে ‘Help Desk’ বা ‘Grievance Corner’ অপশনে গিয়ে আপনার সমস্যার কথা লিখে অনলাইন অভিযোগ জানাতে পারেন।
  • ৩. স্থানীয় কৃষি অফিস (ADA Office): স্থানীয় কৃষি প্রযুক্তি সহায়ক (KPS) এবং সহ-কৃষি অধিকর্তার (ADA) অফিসে পিএম কিষাণের জন্য বিশেষ সহায়তা ডেস্ক থাকে। সেখানে আপনার আধার, জমির পর্চা ও ব্যাংক পাসবই নিয়ে গেলে আধিকারিকেরা সরাসরি সিস্টেম থেকে ভুল সংশোধন করে দেন।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন: একই পরিবারে স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই কি পিএম কিষাণের টাকা পেতে পারেন?

উত্তর: না। পিএম কিষাণের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পরিবারে (স্বামী, স্ত্রী এবং নাবালক সন্তান) কেবল একজনই এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। দুজনে আবেদন করলে একজনের আবেদন বাতিল বা রিফান্ড লিস্টে চলে যাবে।

প্রশ্ন: ভাগচাষী কি পিএম কিষাণের টাকা পাবে?

উত্তর: না। পিএম কিষাণ যোজনার সুবিধা পেতে গেলে কৃষকের নিজস্ব নামে চাষের জমি বা খতিয়ান থাকা বাধ্যতামূলক। ভাগচাষী বা লিজ নেওয়া চাষীরা এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত নন।

Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top