
কৃষিকাজ কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি বিশুদ্ধ বিজ্ঞান। যদি আমরা একটু বুঝে নিয়ে গাছের খাদ্যের প্রয়োজনীয়তাগুলি পূরণ করতে পারি, তবে জমির উর্বরতা শক্তি যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি গাছের বৃদ্ধি ভালো হবে। সঠিক গাছের খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে ফসল উৎপাদন করে কম খরচে বেশি লাভবান হওয়া যায়।
উদ্ভিদ জগত অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। একটি উদ্ভিদে কমবেশি ৯০ ধরনের বিভিন্ন মৌল উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়। তবে দীর্ঘ গবেষণার পর বিজ্ঞানী আরনন ও স্টাউট উদ্ভিদের অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান ১৭টি চিহ্নিত করেছেন। এই ১৭টি উপাদানের যেকোনো একটির অভাব হলে গাছের জীবনচক্র বাধাগ্রস্ত হয়। এই অপরিহার্য উপাদানগুলি হলো—কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার, ক্লোরিন, আয়রন, বোরন, জিঙ্ক, কপার, ম্যাঙ্গানিজ, মলিবডেনাম এবং নিকল।
গাছ কিভাবে পুষ্টি গ্রহণ করে?
গাছ সরাসরি কঠিন খাবার খেতে পারে না। প্রায় সব প্রয়োজনীয় গাছের খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান গুলি উদ্ভিদ বা ফসল ‘আয়ন’ (ধনাত্মক বা ঋণাত্মক আয়ন) রূপে প্রধানত মূলের মাধ্যমে আদান-প্রদান করে। একে ‘আয়ন বিনিময়’ বলা হয়। উদ্ভিদের মূল হাইড্রোজেন আয়ন (H+) বা বাইকার্বোনেট (HCO3−) মাটিকে বা মাটির রসে দিয়ে বিনিময়ে ক্যালসিয়াম (Ca2+), পটাশিয়াম (K+), ম্যাগনেসিয়াম (Mg2+) ইত্যাদি মৌলগুলি মাটি কণা (Clay) থেকে গ্রহণ করে।
একইভাবে হিউমাস বা জৈব অবশেষ থেকে অ্যামোনিয়াম (NH4+) আয়ন এবং অণুজীবের ক্রিয়ায় উৎপন্ন নাইট্রেট (NO3−) গাছ গ্রহণ করে। তবে মনে রাখতে হবে, নাইট্রিফিকেশন ব্যাকটেরিয়া দ্বারা অক্সিজেন পচনের ফলে অনেক সময় নাইট্রোজেন গ্যাস হয়ে বাতাসে মিশে যায়। অতিরিক্ত অ্যামোনিয়ামও বাতাসে মিশে নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তাই মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
আড়ও দেখুন ফসল উৎপাদনে মাটির গুরুত্ব: কম সার প্রয়োগে ফসল হবে দিগুণ
উদ্ভিদের খাদ্য ও তার উৎস: বিস্তারিত আলোচনা
গাছের খাদ্যের উৎস ও কাজ বুঝতে নিচে প্রতিটি উপাদানের ভূমিকা গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করা হলো:
১. কার্বন (C) – প্রধান গাঠনিক উপাদান
- ভূমিকা: উদ্ভিদের সঞ্চিত খাদ্যবস্তু গঠনে এর ভূমিকা সবথেকে বড়। গাছের শুষ্ক ওজনের সিংহভাগই হলো কার্বন।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: পাতার মাধ্যমে বাতাস থেকে সরাসরি কার্বন-ডাই-অক্সাইড রূপে গ্রহণ করে।
২. অক্সিজেন (O) – প্রাণের ভিত্তি
- ভূমিকা: সালোকসংশ্লেষণ ও শ্বসন প্রক্রিয়ায় এটি সবথেকে বেশি লাগে। শর্করা ও শক্তি উৎপাদনে এর বিকল্প নেই।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: পাতা এবং মূলের মাধ্যমে বাতাস ও জল থেকে।
৩. হাইড্রোজেন (H) – জলের দান
- ভূমিকা: খাদ্য গঠনে এটি তৃতীয় বৃহত্তম উপাদান। হাইড্রোজেন ছাড়া গাছের প্রোটোপ্লাজম তৈরি সম্ভব নয়।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: মূল ও পাতার মাধ্যমে জল (H2O) থেকে সংগ্রহ করে।
৪. নাইট্রোজেন (N) – দ্রুত বৃদ্ধির কারিগর
- ভূমিকা: এটি গাছের দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হিসেবে পরিচিত। ক্লোরোফিল, প্রোটিন, এনজাইম ও হরমোন গঠনে এর কাজ অপরিসীম।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: প্রধানত মূলের মাধ্যমে নাইট্রেট ও অ্যামোনিয়াম রূপে।
৫. ফসফরাস (P) – শক্তির জোগানদার
- ভূমিকা: কোষ ও নিউক্লিয়াস গঠন করে। চারা অবস্থায় শিকড়ের বৃদ্ধি এবং পাশকাঠি ছাড়ার সময় এটি অত্যাধিক প্রয়োজন।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: শিকড়ের মাধ্যমে মাটি থেকে এবং জলে দ্রবণীয় অবস্থায় পাতা থেকে।
আড়ও দেখুন ভার্মি কম্পোস্ট কী? কেঁচো সার বানানোর পদ্ধতি ও মার্কেটিং
৬. পটাশিয়াম (K) – রোগ প্রতিরোধক
- ভূমিকা: এটি কোষে দ্রবণ অবস্থায় থাকে। হরমোন, শর্করা ও এনজাইম সংবহন এবং কোষ বিভাজনে সাহায্য করে।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: মূলের মাধ্যমে দ্রবণীয় অবস্থায়।
৭. ক্যালসিয়াম (Ca) – কোষ প্রাচীর রক্ষক
- ভূমিকা: কোষ প্রাচীর গঠন ও কোষ বিভাজনে সাহায্য করে। এর অভাবে গাছের বাড়ন্ত ডগা মরে যায়।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: মূলের মাধ্যমে মাটি থেকে। বেলে ও জৈব পদার্থহীন মাটিতে এর অভাব বেশি হয়।
৮. ম্যাগনেসিয়াম (Mg) – ক্লোরোফিলের প্রাণ
- ভূমিকা: এটি ক্লোরোফিলের কেন্দ্রীয় মৌল। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় এটি সরাসরি কাজ করে।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: শিকড়ের মাধ্যমে মাটি থেকে।
৯. সালফার (S) – প্রোটিন ও তেলের উৎস
- ভূমিকা: অ্যামাইনো অ্যাসিড ও প্রোটিন গঠন করে। বিশেষ করে সরিষা ও পেঁয়াজ জাতীয় ফসলে তেল ও ঝাঁঝ বৃদ্ধিতে এটি দরকার।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: মূলের মাধ্যমে সালফেট রূপে।
১০. আয়রন বা লোহা (Fe) – ক্লোরোফিলের সহায়তাকারী
- ভূমিকা: ক্লোরোফিল গঠনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এর অভাবে কচি পাতা সাদাটে হয়ে যায়।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: মূলের মাধ্যমে আয়রন আয়ন রূপে।
১১. বোরন (B) – ফল ও ফুলের রক্ষক
- ভূমিকা: মাটিতে খুব কম পরিমাণে লাগে, কিন্তু না থাকলে ফল ফেটে যায় এবং ফুল ঝরে পড়ে। কপির কাণ্ড ফাঁপা হওয়া এর বড় লক্ষণ।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: মূলের মাধ্যমে এবং তরল সার হিসেবে পাতার মাধ্যমে।
১২. জিঙ্ক বা দস্তা (Zn) – হরমোন নিয়ন্ত্রক
- ভূমিকা: উদ্ভিদের দৈহিক বৃদ্ধিতে অক্সিন হরমোন তৈরিতে এটি কাজ করে।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: ক্ষারধর্মী মাটিতে এর অভাব হয়। ভুট্টা ও লেবু চাষে এটি বিশেষ জরুরি।
১৩. কপার বা তামা (Cu) – এনজাইম সক্রিয়কারী
- ভূমিকা: এনজাইম গঠনে ও গাছের বিপাকীয় কাজে লাগে। বেলে বা অম্ল মাটিতে এর অভাব দেখা যায়।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: মূল ও পাতার মাধ্যমে খুব সামান্য পরিমাণে।
১৪. ম্যাঙ্গানিজ (Mn) – বিপাকীয় কারিগর
- ভূমিকা: সালোকসংশ্লেষণ ও নাইট্রোজেন বিপাকে সাহায্য করে। এর অভাবে পাতার শিরার মাঝখানের অংশ হলুদ হয়।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: দ্রবণীয় লবণের মাধ্যমে।
১৫. মলিবডেনাম (Mo) – নাইট্রোজেন সংবন্ধক
- ভূমিকা: এটি ডাল জাতীয় ফসলের মূলে নাইট্রোজেন জমা করতে সাহায্য করে। লেবু ও ফুলকপিতে এর অভাব বেশি দেখা যায়।
- গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: সারের সাথে মিশিয়ে শিকড়ের মাধ্যমে।
১৬. ক্লোরিন (Cl) – পরাগ ও অসমোটিক নিয়ন্ত্রণ
ভূমিকা: এটি সালোকসংশ্লেষণে সহায়তা করে এবং কোষের রসস্ফীতি বজায় রাখে।
গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: মাটির জল থেকে মূলের মাধ্যমে।
১৭. নিকল (Ni) – ইউরিয়া বিভাজক
ভূমিকা: ইউরিয়া সারকে ভেঙে গাছকে গ্রহণ করতে সাহায্য করে এবং বীজের অঙ্কুরোদগমে ভূমিকা রাখে।
গ্রহণের মাধ্যম ও উৎস: মাটি থেকে অতি সামান্য পরিমাণে।
উদ্ভিদের পুষ্টি অভাবজনিত লক্ষণ ও সমাধান
গাছে সঠিক গাছের খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান না থাকলে বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন:
- নাইট্রোজেনের অভাবে পুরনো পাতা হলুদ হয়।
- ফসফরাসের অভাবে পাতা বেগুনী বা তামাটে রঙ ধারণ করে।
- পটাশিয়ামের অভাবে পাতার চারপাশ পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়।
মাটির উর্বরতা রক্ষা ও গাছের দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হিসেবে সবসময় জৈব সার ও হিউমাসের ওপর জোর দেওয়া উচিত। জৈব সার দিলে মাটিতে উপকারী জীবাণুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যা খনিজ উপাদানগুলিকে গাছের গ্রহণোপযোগী করে তোলে। মাটিতে জীবাণু বৃদ্ধি ও নাইট্রোজেন ফিক্সন জীবামৃত তৈরি পদ্ধতি পড়ুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. গাছের খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান প্রধানত কয়টি এবং কী কী?
উত্তর: উদ্ভিদের স্বাভাবিক জীবনচক্র সম্পন্ন করার জন্য মোট ১৭টি অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। এদের মধ্যে প্রধান উপাদান হলো নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম (NPK)। এছাড়াও কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার এবং অন্যান্য অনুখাদ্য যেমন—জিঙ্ক, বোরন, লোহা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
২. উদ্ভিদের অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান ১৭টি-র মধ্যে অনুখাদ্য কেন প্রয়োজন?
উত্তর: বোরন, জিঙ্ক, কপার বা মলিবডেনামের মতো অনুখাদ্যগুলো উদ্ভিদে খুব সামান্য পরিমাণে লাগলেও এদের গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন—বোরনের অভাবে ফল ফেটে যায় এবং জিঙ্কের অভাবে গাছের বৃদ্ধি থমকে যায়। তাই সুষম ফলনের জন্য এই ১৭টি উপাদানের উপস্থিতি মাটিতে থাকা জরুরি।
৩. গাছের দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হিসেবে কোন পুষ্টি উপাদান সবথেকে কার্যকর?
উত্তর: নাইট্রোজেন (N) হলো গাছের দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হিসেবে সবথেকে কার্যকরী উপাদান। এটি ক্লোরোফিল ও প্রোটিন তৈরি করে গাছকে দ্রুত বড় ও সবুজ করতে সাহায্য করে। তবে শুধু নাইট্রোজেন নয়, সুষম বৃদ্ধির জন্য ফসফরাস ও পটাশিয়ামের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
৪. গাছের খাদ্যের উৎস ও কাজ কীভাবে মাটির উর্বরতা বাড়ায়?
উত্তর: গাছ মাটি, জল ও বাতাস থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে। গাছের খাদ্যের উৎস ও কাজ মূলত মাটির অণুজীব ও হিউমাসের ওপর নির্ভরশীল। জৈব পদার্থ পচে যখন হিউমাস তৈরি হয়, তখন তা মাটিতে পুষ্টি উপাদানগুলোকে ধরে রাখে এবং গাছের শিকড়কে সহজে খাদ্য গ্রহণে সহায়তা করে।
৪. গাছের খাদ্যের উৎস ও কাজ কীভাবে মাটির উর্বরতা বাড়ায়?
উত্তর: গাছ মাটি, জল ও বাতাস থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে। গাছের খাদ্যের উৎস ও কাজ মূলত মাটির অণুজীব ও হিউমাসের ওপর নির্ভরশীল। জৈব পদার্থ পচে যখন হিউমাস তৈরি হয়, তখন তা মাটিতে পুষ্টি উপাদানগুলোকে ধরে রাখে এবং গাছের শিকড়কে সহজে খাদ্য গ্রহণে সহায়তা করে।
৫. উদ্ভিদের পুষ্টি অভাবজনিত লক্ষণগুলি কীভাবে চেনা যায়?
উত্তর: পুষ্টির অভাবে গাছে বিভিন্ন সংকেত দেখা দেয়। যেমন—নাইট্রোজেনের অভাবে পুরনো পাতা হলুদ হয়ে যায়, ফসফরাসের অভাবে পাতা তামাটে রঙ ধারণ করে এবং পটাশিয়ামের অভাবে পাতার চারপাশ পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়। এই লক্ষণগুলো দেখে সঠিক সার প্রয়োগ করলে গাছের স্বাস্থ্য দ্রুত ফিরে আসে।
তথ্য সূত্র
- প্রাকৃতিক কৃষি মিশন (NMNF)










