মাছ চাষে চুন প্রয়োগ কেন করা হয় এবং কিভাবে করে ? মাছ চাষে চুন প্রয়োগের গুরুত্ব এবং প্রকারভেদ

মাছ চাষে চুন প্রয়োগ কেন করা হয় এবং এর গুরুত্ব।
পুকুরের পরিবেশ ও পানির গুণমান ঠিক রাখতে সঠিক নিয়মে চুন প্রয়োগ।

মাছ চাষের পুকুরে মাছের ভাল ফলন পেতে হলে প্রাকৃতিক খাদ্য উদ্ভিদকণা বা ফাইটোপ্লাংকটনের জন্ম ও বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। মাটিতে আবদ্ধ অবস্থায় থাকা বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদানগুলাকে ব্যবহারযোগ্য করার জন্য চুন ও সার প্রয়োগ করতে হয়। বিশেষ করে নতুন চাষিদের মনে প্রশ্ন জাগে যে মাছ চাষে চুন প্রয়োগ কেন করা হয়? মূলত পুকুরের পরিবেশ ঠিক রাখতে এর কোনো বিকল্প নেই।

মাছ চাষে চুন প্রয়োগ কেন করা হয়

মাছ চাষে চুনের মত এরকম উপকারী দ্বিতীয় আর কোন পদার্থ নেই। চুনের প্রধান কাজ হলো পুকুরের তলাকার মাটি ও জলের অভাব দূর করা। এছাড়া মাছ চাষে চুন প্রয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম। চুনের অন্যান্য গুণগুলাে হলো:

১) নাইট্রোজেনের জোগান: মাছের বৃদ্ধির জন্য পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকা দরকার। এই প্রাকৃতিক খাদ্যের পুষ্টির জন্য নাইট্রোজেন দরকার। চুন পুকুরের জৈব পদার্থের পচনক্রিয়া দ্রুততর করে পুকুরে ব্যবহারযােগ্য নাইট্রোজেনর পরিমাণ বাড়িয়ে তােলে, ফলে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যপ্ত পরিমাণে জন্মায়।

২) ফসফেট মুক্তকরণ: পুকুরে উদ্ভিদকণার বৃদ্ধির জন্য ব্যবহারযােগ্য ফসফেট দরকার। ফসফেটের এই ব্যবহার যােগ্যতা মাটির পি এইচের মানের উপর নির্ভর করে। মাটির পি এইচ মাত্রা ৬.৫-৭.৫ এর মধ্যে থাকলে পুকুরে ব্যবহারযােগ্য ফসফেট ভালাে পরিমাণে পাওয়া যায়। কিন্তু মাটির পি এইচ মান ৬.৫ এর কম হলে অর্থাৎ মাটি খুব অম্ল হলে, ফসফেট লােহা ও অ্যালুমিনিয়ামের সঙ্গে আবদ্ধ থাকে এবং এই ফসফেটকে উদ্ভিদকণা ব্যবহার করতে পারে না। চুন প্রয়ােগ করলে মাটির অম্লভাব দূর হয় ফলে ফসফেট আবদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয় এবং উদ্ভিদকণা ফসফেটকে ব্যবহার করতে পারে। তাই মাছ চাষের পুকুরে সারের সুফল পেতে হলে সার প্রয়ােগের আগে পুকুরে চুন প্রয়ােগ করে মাটির অম্লভাব দূর করে নিতে হয়।

৩) বাফার হিসেবে কাজ: দিনের বেলা পুকুরে জলের পি এইচ মানের ওঠা নামা পুকুরের মােট অ্যালকালিনিটির মানের উপর নির্ভর করে। পুকুরে অ্যালকানিটির পরিমাণ খুব কম হলে সকালবেলার পি এইচ এবং বিকালবেলার পি এইচ মানের পার্থক্য খুব বেশী পরিমাণে হয়, যা মাছ চাষের পক্ষে ক্ষতিকারক। চুন ব্যবহারের ফলে পুকুরে অ্যালকালিনিটির পরিমাণ বাড়ে এবং এই চুন পুকুরে বাফার হিসাবে কাজ করে। ফলে পুকুরের জলের সকাল ও বিকাল বেলার পি এইচ মানের খুব বেশী পার্থক্য হয় না এবং পুকুরে মাছ চাষের পথে অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকে।

৪) ক্যালসিয়াম বৃদ্ধি: চুনে ক্যালসিয়াম থাকে তাই চুন প্রয়ােগে পুকুরে ক্যালসিয়াম বাড়ে, ফলে পুকুরের উৎপাদনশীলতা বাড়ে।

৫) রোগ নিরাময়: চুন তার অতিক্ষারকীয় বৈশিষ্ট্য দ্বারা মাছের কয়েকটি রোগের নিরাময় করতে সাহায্য করে।

৬) অক্সিজেন বৃদ্ধি: চুন জলের ঘােলাটে ভাবকে দূর করে জলের ভৌত অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে পরােক্ষ ভাবে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে।

৭) গ্যাস নষ্ট করা: চুন পুকুরে বিষাক্ত গ্যাস নষ্ট করে।

আড়ও দেখুন বড় মাছ চাষ পদ্ধতি: পুকুর প্রস্তুতি ও হাতে খাদ্য তৈরির নিয়ম

পুকুরে ব্যবহৃত চুনের পরিমাণ

পুকুরে চুন কতটা দরকার তা জল ও মাটির পি এইচ ক্রম দেখে নির্ধারিত করা উচিত। পুকুরের তলাকার মাটি ও জল যত বেশী অম্ল হবে চুনের পরিমাণ তত বেশী হবে। পুকুরের পি এইচ প্রায় প্রশম হলে চুন খুব কম পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। চুন প্রয়োগের পরিমাণ বিভিন্ন প্রকার মাটিতে নিম্নরূপ:

মাটির পি এইচ (pH) মাটির প্রকৃতিচুন প্রয়োগের মাত্রা (প্রতি হেক্টর/বৎসর)
৪.০- ৫.০অতি অম্লীয় ২০০০ কেজি
৫.১-৬.১ অল্প অম্লীয়১০০০ কেজি
৬.৬ -৭.৫প্রায় প্রশমিত৫০০ কেজি
৭.৮-৮.৫অল্প ক্ষারীয় ২০০ কেজি
৮.৬ বা তার বেশিঅতি ক্ষারীয়চুন প্রয়োগের দরকার নেই

(বি:দ্র:-হিসেব সুবিধার্থে ১ হেক্টর=২৪৭ শতক এবং ২.৪৭ এর একটু বেশি। যারা একর এ হিসেব করবেন একর দিয়ে ভাগ করে এবং যারা শতক হিসেব এ বিঘা বের করবেন তারা শতক দিয়ে হেক্টর কে ভাগ দিয়ে চুনের বা পোনার বা খাদ্যের হিসেব বের করে নিতে পারেন।)

চুনের প্রকারভেদ ও কার্যকারিতা

মাছ চাষে কেবল চুন দিলেই হয় না, আপনার পুকুরের মাটির অবস্থা বুঝে সঠিক চুন নির্বাচন করা জরুরি। নিচে চুনের প্রকারভেদ ও কার্যকারিতা কীভাবে কাজ করে তা আলোচনা করা হলো:

মাছ চাষে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রকার চুনের তালিকা ও বৈশিষ্ট্য।
মাছ চাষে ব্যবহৃত চুনের প্রকারভেদ—পাথুরে চুন, কলি চুন, কৃষি চুন ও ডলোমাইট।

১. ক্যালসিয়াম অক্সাইড (কুইক লাইম বা পাথুরে চুন)

  • রাসায়নিক সংকেত: CaO
  • প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য: এটি অম্লত্ব প্রশমিত করার ক্ষমতা খুব বেশি রাখে। পানিতে (জলে) মেশালে এটি প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে।
  • কার্যকারিতা ও ব্যবহার: যে সমস্ত পুকুরের মাটি ও পানি খুব অম্লযুক্ত, সেই সমস্ত পুকুরে এই চুন ব্যবহার করলে খুব দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া মাছ রোগাক্রান্ত হলে এই চুন ব্যবহার করা বিশেষ কার্যকর।

২. ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড (কলি চুন)

  • রাসায়নিক সংকেত: Ca(OH)2​
  • প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য: এর অম্লত্ব প্রশমিত করার ক্ষমতা পাথুরে চুনের তুলনায় কিছুটা কম। এটিও পানিতে মেশালে তাপ উৎপন্ন করে।
  • কার্যকারিতা ও ব্যবহার: মাছ চাষের পুকুরে সাধারণত এর ব্যবহার খুব কম দেখা যায়।

৩. ক্যালসিয়াম কার্বনেট (কৃষি চুন বা কৃষিকার্যে ব্যবহৃত চুন)

  • রাসায়নিক সংকেত: CaCO3​
  • প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য: এটি মাটির অম্লত্ব হঠাৎ করে বাড়িয়ে দিতে পারে না, কারণ এর অম্লত্ব প্রশমিত করার ক্ষমতা খুবই কম। পানির সঙ্গে মেশালে এটি কোনো তাপ উৎপন্ন করে না।
  • কার্যকারিতা ও ব্যবহার: এটি মূলত কৃষিকাজে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে যে সমস্ত পুকুরের পানির পিএইচ ৮ বা তার বেশি, সেখানে এই চুন ব্যবহার করা নিরাপদ। এটি চুনের অন্যান্য উপকারিতাগুলো বজায় রাখে কিন্তু পিএইচ-কে হুট করে বিপজ্জনক স্তরে নেয় না।

৪. ডলোমাইট

  • রাসায়নিক সংকেত: CaCO3​.MgCO3​
  • প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য: এর অম্লত্ব প্রশমিত করার ক্ষমতা খুব কম। এই চুনের বিশেষত্ব হলো এতে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ম্যাগনেসিয়ামও থাকে।
  • কার্যকারিতা ও ব্যবহার: পুকুরে উদ্ভিদকণার পুষ্টির জন্য ম্যাগনেসিয়াম খুবই দরকারি। যদিও মিষ্টি জলে এর ব্যবহার কম, তবুও অন্যান্য চুনের সঙ্গে অল্প পরিমাণে এটি ব্যবহার করলে উদ্ভিদকণার পুষ্টিতে ভালো সুফল পাওয়া যায়।

আড়ও দেখুন মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি: ১৫টি প্রধান রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা

পুকুরে চুন প্রয়োগ ও ব্যবহার পদ্ধতি

মাছ চাষে চুন প্রয়োগ কেন করা হয় জানার পর পুকুরের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সঠিক নিয়মে চুন প্রয়োগ করা আবশ্যক। পুকুরে চুন প্রয়োগ ও ব্যবহার পদ্ধতি নিচে দেওয়া হলো:

  • ১) পুকুর প্রস্তুতি: মাছ চাষের প্রথম ধাপ হলো পুকুর প্রস্তুতি। তাই বর্ষার আগে শুকনো পুকুরে চুন মাটিতে ছড়িয়ে লাঙ্গল দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে ফেলতে হয়।
  • ২) জল থাকা পুকুরে প্রয়োগ: পুকুরে জল আছে এমন অবস্থায় ক্যালসিয়াম অক্সাইড (পাথুরে চুন) প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টা আগে পাত্রে পানি (জলে মিশ্রিত করে), ওই দ্রবণ নৌকা বা বড় কোনো পাত্রের সাহায্যে পুকুরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে দিতে হবে।

পুকুরে চুন প্রয়োগের সঠিক সময়

চুন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সময় জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। পুকুরে চুন প্রয়োগের সঠিক সময় সম্পর্কে আপনার ধারণা থাকা উচিত: যদি স্থির করেন যে চুন পুকুরে দিবেন তাহলে খুব সকালের দিকে পুকুরে চুন প্রয়োগ করা উচিত। কারণ এই সময় জলের পি এইচ (pH) কম থাকে। যত রোদ উঠবে তত পুকুরের উদ্ভিদকণার সালোকসংশ্লেষের হার বাড়তে থাকবে এবং সেই সঙ্গে জলের পি এইচ মাত্রাও বাড়তে থাকবে। তাই বিকেলের দিকে চুন প্রয়োগ করলে জলের পি এইচ হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে, যা মাছ চাষের পক্ষে ক্ষতিকর।

পুকুরে মাছ চাষে চুন প্রয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম তাই পুকুরে নিয়মিত নিয়মমাফিক চুন এর প্রয়োগ করলে রোগ কম হবে এবং মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: মাছ চাষে চুন প্রয়োগ কেন করা হয়?

উত্তর: পুকুরের মাটির অম্লভাব দূর করতে, পানি পরিষ্কার রাখতে এবং মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য (উদ্ভিদকণা) বৃদ্ধিতে চুন প্রয়োগ করা হয়। এছাড়া এটি মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং ক্ষতিকারক গ্যাস নষ্ট করতে সাহায্য করে।

প্রশ্ন ২: পুকুরে চুন প্রয়োগের সঠিক সময় কোনটি?

উত্তর: পুকুরে চুন প্রয়োগের সবথেকে ভালো সময় হলো খুব সকালবেলা। কারণ এই সময় পানির পিএইচ (pH) কম থাকে। রোদের তীব্রতা বাড়লে সালোকসংশ্লেষের কারণে পিএইচ বেড়ে যায়, যা বিকেলের দিকে চুন দিলে মাছের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

প্রশ্ন ৪: মাছের পুকুরে কোন চুন সবথেকে ভালো কাজ করে?

উত্তর: অতি অম্লযুক্ত মাটি ও পানিতে ক্যালসিয়াম অক্সাইড (পাথুরে চুন) সবথেকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করে। তবে পিএইচ ৮-এর উপরে থাকলে কৃষি চুন বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট ব্যবহার করা নিরাপদ।

প্রশ্ন ৩: চুন কি সরাসরি পুকুরে দেওয়া যায়?

উত্তর: না, পাথুরে চুন সরাসরি দেওয়া উচিত নয়। এটি ব্যবহারের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে একটি বড় পাত্রে পরিষ্কার পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হয়। এরপর তৈরি হওয়া মিশ্রণ বা দ্রবণটি সারা পুকুরে সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে হয়।

তথ্যসূত্র

  • মৎস বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ।
  • মৎস গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ।
Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top