
মাছ চাষে অল্প খরচে দ্বিগুণ লাভ নিশ্চিত করতে বর্তমানে পুকুরে মিশ্র মাছ চাষ পদ্ধতি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সঠিক নিয়ম মেনে চাষ করলে একই পুকুর থেকে দেশী ও বিদেশী কার্প জাতীয় মাছের বাম্পার ফলন পাওয়া সম্ভব। আজকের আর্টিকেলে আমরা মিশ্র মাছ চাষের খুঁটিনাটি এবং পোনা মজুতের আদর্শ নিয়ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. মিশ্র মাছ চাষ কাকে বলে?
পুকুরের বিভিন্ন স্তরের প্রাকৃতিক খাদ্যকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করার জন্য যখন একই পুকুরে কামড়াকামড়ি না করে একাধিক প্রজাতির (দেশী ও বিদেশী) মাছ একত্রে চাষ করা হয়, তাকে মিশ্র মাছ চাষ বলে।
প্রচলিত প্রথায় কেবল রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছ একত্রে চাষ করে বছরে হেক্টর প্রতি মাত্র ৬০০ কেজি মাছ উৎপন্ন হতো। কিন্তু আধুনিক পুকুরে মিশ্র মাছ চাষ পদ্ধতি মেনে এই তিনটির সঙ্গে আরও তিনটি বিদেশী মাছ—সিলভার কার্প, গ্রাসকার্প ও সাইপ্রিনাস কার্প (কমন কার্প) একত্রে চাষ করে বছরে হেক্টর প্রতি ৬০০০ কেজি পর্যন্ত মাছ উৎপাদন করা সম্ভব।
২. মিশ্র মাছ চাষের সুবিধা ও জলজ স্তরের বিন্যাস
পুকুরে মিশ্র মাছ চাষ পদ্ধতি-তে এই ছয় প্রজাতির মাছ একত্রে চাষ করলে পুকুরের সব অংশের খাদ্য সম্পূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সুবিধাগুলি নিচে দেওয়া হলো:
জলের উপরের স্তর (কাতলা ও সিলভার কার্প): কাতলা মাছের ফুলকার অন্তর্গঠন প্রাণীকণা (Zooplankton) গ্রহণে বেশি উপযোগী। অন্যদিকে সিলভার কার্প তার রেকারযুক্ত ফুলকা দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদকণা (Phytoplankton) গ্রহণ করে। তাই একই স্তরে থাকলেও এদের মধ্যে খাদ্যের প্রতিযোগিতা হয় না। সিলভার কার্প জলের অতিরিক্ত উদ্ভিদকণা খেয়ে জল সবুজ হয়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
জলের মধ্য স্তর (রুই ও গ্রাসকার্প): রুই মাছ ছোট অবস্থায় প্রাণীকণা এবং বড় হলে উদ্ভিদকণা ও জলজ উদ্ভিদের নরম পাতা খায়। গ্রাসকার্পের প্রধান খাদ্য হলো ঝাঁঝি, ঘাস ও জলজ উদ্ভিদ। ফলে এদের মধ্যেও খাদ্যের কোনো প্রতিযোগিতা নেই।
জলের নিচের স্তর (মৃগেল ও সাইপ্রিনাস কার্প): এরা পুকুরের তলদেশের কাদা-মাটির সাথে লেগে থাকা উদ্ভিদ, প্রাণীজ খাদ্য ও জৈব পদার্থ খায়। সাইপ্রিনাস কার্প সর্বভুক হওয়ায় জলের নিচের পচা জৈব আবর্জনা খেয়ে পুকুরের পরিবেশ ভালো রাখে।
বিশেষ সুবিধা: বিদেশী মাছগুলোর বৃদ্ধির হার দেশী পোনা মাছের চেয়ে অনেক বেশি। সিলভার কার্প কাতলার চেয়ে দ্রুত বাড়ে, নিয়মিত ঘাস খাওয়ালে গ্রাসকার্পের বৃদ্ধি হয় রকেটের গতিতে এবং সাইপ্রিনাস কার্প মৃগেল মাছের চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
আড়ও জানতে ক্লিক করুন: ফিশ ফ্যাটেনিং করে বিঘা প্রতি উৎপাদন ২২ কুইনটাল।
৩. মিশ্র মাছ চাষের জন্য পুকুর প্রস্তুতি ও নির্বাচন
আদর্শ মিশ্র মাছ চাষের জন্য মজুত পুকুরটিতে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করে মিশ্র মাছ চাষের জন্য পুকুর প্রস্তুতি করতে হবে:
ক) পুকুর নির্বাচন
- যেসব পুকুরে সারা বছর দেড় থেকে দু’ মিটার জল থাকে এবং পাড় উঁচু (যাতে বর্ষার অতি বৃষ্টিতে ভেসে না যায়), সেই পুকুর আদর্শ।
- পুকুরের মাটি এঁটেল-দোঁয়াশ এবং তলদেশে পাক বা কাদা কম থাকা উচিত।
- পুকুরের আয়তন ১ বিঘা থেকে ১৫ বিঘা পর্যন্ত হতে পারে। পুকুরে অবাধে সূর্যকিরণ পড়ার জন্য পাড়ে (বিশেষ করে পূর্ব দিকে) কোনো বড় গাছপালা রাখা যাবে না (নারকেল বা সুপারি গাছ থাকতে পারে)।
খ) চারা পোনা ছাড়ার আগে পুকুর পরিচর্যা
- জলজ উদ্ভিদ নিয়ন্ত্রণ: গ্রাসকার্পের খাদ্য নয় এমন অপ্রয়োজনীয় জলজ উদ্ভিদ কায়িক পরিশ্রমের দ্বারা টেনে তুলে ফেলতে হবে।
- ক্ষতিকারক ও রাক্ষুসে মাছ নিধন: পুকুরে ২৫০ পিপিএম (PPM) হারে মহুয়া খোল প্রয়োগ করতে হবে। এতে অপ্রয়োজনীয় সব মাছ মারা যাবে। এই খোলের বিষক্রিয়া ২ সপ্তাহ পর কেটে যায় এবং পরবর্তীতে এটি উৎকৃষ্ট সার হিসেবে পুকুরে প্রচুর প্রাকৃতিক খাদ্যকণা জন্মাতে সাহায্য করে।
- চুন প্রয়ােগ: মহুয়া খোল ব্যবহারের ৭ দিন পর একর প্রতি ৯০ থেকে ১০০ কেজি চুন প্রয়ােগ করতে হবে।
- সার প্রয়ােগ: পুকুরে মহুয়া খোল দেওয়ার পর যদি পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্যকণা না জন্মায়, তবে বিঘা প্রতি ৫০০ কেজি হারে গোবর সার দিতে হবে। আর যদি মহুয়া খইল প্রয়ােগ না করা হয়ে থাকে, তবে বিঘা প্রতি ১০০০ কেজি হারে গোবর সার দিতে হবে।
- রাসায়নিক সার: পুকুরে উদ্ভিদকণা কম থাকলে বিঘা প্রতি ইউরিয়া ৪-৫ কেজি এবং সিঙ্গেল সুপার ফসফেট ৫.৫-৬ কেজি হারে প্রয়ােগ করা দরকার।
৪. মিশ্র মাছ চাষে পোনা মজুতের আদর্শ পদ্ধতি ও হার
মিশ্র চাষে পোনা মজুতের হার পুকুরের উর্বরতা ও চাষীর অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। সাধারণত বিঘা প্রতি ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি মাপের ১০০০ থেকে ১৫০০ টি চারা পোনা ছাড়া ভালো।
নিচের সঠিক সংখ্যা ও অনুপাত অনুযায়ী মাছ মজুত করা যায়:
৩ প্রজাতির চাষের ক্ষেত্রে:
- কাতলা মাছ: ৪০ টি
- রুই মাছ: ৩০ টি
- মৃগেল মাছ: ৩০ টি
৬ প্রজাতির মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে:
- কাতলা মাছ: ১০ টি
- রুই মাছ: ৩০ টি
- মৃগেল মাছ: ১৫ টি
- সিলভার কার্প মাছ: ২০ টি
- গ্রাসকার্প মাছ: ১০ টি
- সাইপ্রিনাস কার্প মাছ: ১৫ টি
রোগমুক্ত করার পদ্ধতি: চারা পোনা গুলিকে রোগমুক্ত করার জন্য পুকুরে ছাড়ার আগে ৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ৫ লিটার জলে গুলে নিতে হবে। সেই জলে মাছগুলিকে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড ডুবিয়ে রাখার পর পুকুরে ছাড়তে হবে।
আড়ও দেখুন – পুকুরে দেশী মাগুর মাছ চাষের সহজ পদ্ধতি।
৫. পুকুরে চারাপোনা ছাড়ার পর পরিচর্যা ও সার প্রযোগ
চারাপোনা ছাড়ার পর পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্যের সমতা বজায় রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা ও চুন-সার প্রয়োগ করতে হবে।
ক) নিয়মিত সার প্রয়ােগ
- সার প্রয়ােগের মাত্রা জল ও মাটির গুনাগুণের ওপর নির্ভর করে। সেচি ডিস্ক (Secchi Disk) ব্যবহার করে জলের স্বচ্ছতা নির্ণয় করে সার প্রয়ােগ করা উচিত।
- সাধারণত পোনা ছাড়ার পর ১৫ দিন অন্তর অন্তর জৈব ও অজৈব সার ব্যবহার করা হয়।
- পুকুরে প্রতি মাসে বিঘা প্রতি ইউরিয়া ৪-৫ কেজি, সিঙ্গল সুপার ফসফেট ৫-৬ কেজি এবং গােবর ১০০ কেজি প্রয়ােগ করতে হবে।
- সতর্কতা: পুকুরের জলের রঙ যদি ঘন সবুজ বা হলদে বাদামী হয় এবং জলের স্বচ্ছতা যদি ২৫ সেন্টিমিটারের নীচে নেমে আসে, তবে রাসায়নিক সার প্রয়ােগ বন্ধ রাখতে হবে।
সারের সুফল ভালোভাবে পেতে ৭-১০ দিন অন্তর খুব হালকা মাত্রায় সার দেওয়া ভালো। পুকুরে পরিপূরক খাদ্যের কিছু অংশ পচেও সারের কাজ করে, তাই চাষের ৫-৬ মাস পর সারের মাত্রার ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে।
খ) চুন প্রয়ােগ ও জালটানা
- প্রতি সপ্তাহে পুকুরের পিএইচ (pH) দেখে চুন প্রয়ােগ করা ভালো। সাধারণত মাসে বিঘা প্রতি ৫ থেকে ১০ কেজি হারে চুন ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
- সার প্রয়ােগের ২-৩ দিন আগে চুন প্রয়োগ করলে পুকুরের অ্যালকালিনিটি বা ক্ষারত্ব বাড়ে এবং সারের কার্যকারিতা দ্রুত প্রকাশ পায়। চুন দেওয়ার পর জাল টেনে জল ঘেঁটে দিতে হবে।
- স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জালটানা: ১৫ দিন অন্তর একবার করে পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। সংগৃহীত মাছকে হালকা লবণ জলে কয়েক সেকেন্ড ডুবিয়ে আবার পুকুরে ছেড়ে দিলে তাদের রোগবালাই কমে এবং জাল টানার ফলে মাছের ভালো শারীরিক ব্যায়াম হয়, যা তাদের দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
৬. মিশ্র মাছ চাষের খাদ্য তালিকা ও প্রয়োগ পদ্ধতি
পুকুরে মাছের বৃদ্ধি দ্রুত করার জন্য নিয়মিত সঠিক পরিমাণে সুষম খাদ্য দেওয়া আবশ্যিক।
ক) পরিপূরক খাদ্য তৈরির নিয়ম
মিশ্র মাছ চাষের খাদ্য তালিকায় চালের কুঁড়োর সঙ্গে সরষে, বাদাম বা তিলের যেকোনো এক প্রকার খোল সমান পরিমাণে মিশিয়ে মাছের খাদ্য তৈরি করা হয়। সাধারণত সরষের খোল ও চালের কুঁড়ো সমহারে (১:১ অনুপাতে) মিশিয়ে এই মিশ্র মাছ চাষের খাদ্য তালিকা তৈরি করা হয়।
খ) মাছের ওজন অনুসারে খাদ্য প্রয়োগ তালিকা
| দিন | মাছের ওজন | মাছ বাচার সংখ্যা | দেহের ওজনের % খাদ্য পরিমাণ |
|---|---|---|---|
| ১-৯০ | ২৫-১০০ | ১০০০ | ৩-২.৫% |
| ৯১-১৮০ | ১০০-২৫০ | ৯৫০ | ২.৫-২ % |
| ১৮১ -২৭০ | ২৫০-৪৫০ | ৯০০ | ২-১.৫ % |
| ২৭১-৩৬০ | ৪৫০-৭০০ | ৯০০ | ১.৫-১.২% |
গ) খাদ্য পরিবেশন পদ্ধতি
- শুকনো খাবার: খাদ্য শুকনো অবস্থায় পুকুরের জলের উপরিভাগে ছড়িয়ে দিলে মাছ তা সরাসরি গ্রহণ করতে পারে।
- ট্রে বা ঝুড়ি পদ্ধতি: সরষের খোল এবং চালের কুঁড়ো সমপরিমাণে নিয়ে সামান্য জলের সঙ্গে মিশিয়ে গোল গোল ঢেলা বা মণ্ড তৈরি করতে হবে। এরপর জলের নির্দিষ্ট গভীরতা মেপে একটি বাঁশের ঝুড়ি বা ট্রে-র মধ্যে রেখে খাবারটি পরিবেশন করতে হবে। ঝুড়িটি যাতে ভেসে না যায়, তাই দড়ি দিয়ে পুকুর পাড়ের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখতে হবে।
- খাদ্য পর্যবেক্ষণ: খাবার দেওয়ার ১ থেকে ২ ঘণ্টা পর ঝুড়িটি তুলে দেখতে হবে মাছ কতটা খাবার খেয়েছে। সেই অনুযায়ী পরবর্তী দিনে খাবারের পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো যাবে। প্রতিদিনের মোট খাদ্যের অর্ধেক অংশ সকালে এবং বাকি অর্ধেক অংশ বিকেলে প্রয়োগ করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। ১ বিঘার একটি পুকুরে এইরকম ৩-৪টি ঝুড়িতে খাবার ভাগ করে দেওয়া উচিত।
৭. পরিপূরক খাদ্যের পরিমাণ নির্ণয়ের সঠিক গাণিতিক হিসাব
পুকুরে মিশ্র মাছ চাষ পদ্ধতি-তে মাছের দেহের ওজনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিনের খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হয়। নিচে দুটি উদাহরণ দিয়ে হিসাবটি সহজে বুঝিয়ে দেওয়া হলো:
উদাহরণ ১: চাষের শুরুতে (পোনা ছাড়ার প্রথম দিন)
- যদি ১টি পুকুরে ১০০০টি চারাপোনা ছাড়া হয় এবং প্রতিটির গড় ওজন হয় ২৫ গ্রাম:
- পুকুরে মোট মাছের ওজন = মাছের মোট সংখ্যা × একটি মাছের ওজন
- অর্থাৎ, ১০০০ × ২৫ গ্রাম = ২৫,০০০ গ্রাম = ২৫ কিলোগ্রাম।
- মাছের দেহের ওজনের ৩ শতাংশ (৩%) হারে খাদ্য দিলে: প্রতিদিন ১০০ গ্রাম মাছের জন্য ৩ গ্রাম খাদ্য লাগে।
- অতএব, ২৫,০০০ গ্রাম মাছের জন্য খাদ্য লাগবে = (৩×২৫০০০) ÷১০০ = ৭৫০ গ্রাম খাদ্য প্রতিদিন দিতে হবে।
- সুতরাং একটি পুকুরে যদি ১০০০ টি মাছ থাকে ও মোট ওজন ১ কুইন্টাল হয় তাহলে দেহ ওজনের ৩% খাদ্য দিলে (১০০ কেজি ×৩) ক ১০০ =৩ কেজি খাদ্য লাগবে দৈনিক।
উদাহরণ ২: চাষের শেষে (৯ মাস পর)৯ মাস পর
- যদি মাছের গড় ওজন বেড়ে ৮০০ গ্রাম হয়, তবে সেই ১০০০টি মাছের মোট ওজন হবে:
- মোট মাছের ওজন = ১০০০ × ৮০০ গ্রাম = ৮,০০০০০ গ্রাম বা ৮০০ কিলোগ্রাম।
- বড় মাছের ক্ষেত্রে দেহের ওজনের ১.২ শতাংশ (১.২%) হারে খাদ্য দিতে হবে।
- অতএব, প্রতিদিন মোট খাদ্য লাগবে = (৮০০০০০×১.২) ÷১০০ = ৯৬০০ গ্রাম বা ৯ কেজি ৬০০ গ্রাম।
বিঘা প্রতি আদর্শ হিসাব: এই নিয়ম অনুযায়ী ১ বিঘা পুকুরে যদি ১০০০টি পোনা (প্রতিটি ২৫ গ্রাম ওজনের) ছাড়া হয়, তবে শুরুতে দৈনিক ৩% হারে ৭৫০ গ্রাম এবং ৯ মাস পরে দৈনিক ১.২% হারে ৯ কেজি৬০০ গ্রাম খাদ্য প্রতিদিন দিতে হবে।বিশেষ সতর্কতা: প্রতি ১০-১৫ দিন অন্তর জাল টেনে ৫০-৬০টি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে তাদের গড় ওজন পরীক্ষা করে খাবারের পরিমাণ পুনঃনির্ধারণ (১.৫% থেকে ১.২%) করতে হবে। শীতকালে মাছের বিপাক ক্রিয়া কমে যায় এবং তারা খাদ্য কম গ্রহণ করে, তাই এই সময়ে খাবারের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দিতে হবে। এছাড়া কোনো কারণে জল দূষিত হলেও খাদ্য কম দিতে হবে।
৮. গ্রাসকার্প মাছের বিশেষ খাদ্য তালিকা ও নিয়ম
মিশ্র চাষে গ্রাসকার্পের জন্য আলাদা জলজ উদ্ভিদের ব্যবস্থা রাখা জরুরি, কারণ এদের খাদ্যাভ্যাস বাকি মাছের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
- খাদ্য তালিকা: গ্রাসকার্পের জন্য নরম জলজ উদ্ভিদ যেমন—উলফিয়া, লেমনা, হাইড্রিলা এবং ক্ষতিকর নয় এমন কচুরীপানা, কপির পাতা ও নরম ঘাস খাদ্য হিসেবে দিতে হবে।
- খাদ্যের পরিমাণ: গ্রাসকার্পের নিজের যা ওজন, প্রতিদিন ঠিক তার সমপরিমাণ (১০০%) ওজনের সবুজ খাদ্য তাকে দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ: একটি পুকুরে যদি ১০০ গ্রাম ওজনের ১০০টি গ্রাসকার্প থাকে, তবে সেখানে গ্রাসকার্পের মোট ওজন হবে ১০ কেজি। অর্থাৎ, সেই পুকুরে প্রত্যহ ১০ কেজি করে জলজ ঘাস বা উদ্ভিদ সরবরাহ করতে হবে।
- প্রয়োগের নিয়ম: পুকুরে যদি আগে থেকেই কিছু জলজ উদ্ভিদ জন্মে থাকে, তবে বাইরে থেকে দেওয়া খাদ্যের পরিমাণ কমানো যেতে পারে। ঘাসগুলো পুকুরে সরাসরি না ফেলে একটি নির্দিষ্ট ফ্রেম, ঝুড়ি বা ট্রে-তে করে দেওয়া দরকার। মনে রাখা দরকার, পুকুরের অন্যান্য মাছের জন্য তৈরি করা পরিপূরক খাদ্য (খোল-কুঁড়ো) দেওয়ার ঠিক ১ ঘণ্টা আগে গ্রাসকার্পকে এই সবুজ ঘাস খাওয়াতে হবে।
আড়ও দেখুন মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি: মাছের ২০টি প্রধান রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা
৯. মিশ্র মাছ চাষের অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা
পুকুরে মিশ্র মাছ চাষ পদ্ধতি-তে লাভের পরিমাণ অনেক বেশি, তবুও কিছু সাধারণ মিশ্র মাছ চাষের অসুবিধা বা ঝুঁকি রয়েছে যা খেয়াল রাখতে হবে:
১. অক্সিজেনের ঘাটতি: ছয় প্রজাতির মাছ একসাথে থাকার কারণে মেঘলা দিনে বা অতিরিক্ত গরমে পুকুরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
২. পরশ্রম ও সঠিক তদারকি: গ্রাসকার্পের জন্য প্রতিদিন সমপরিমাণ ওজনের ঘাস বাইরে থেকে সংগ্রহ করে পুকুরে দেওয়া বেশ কায়িক পরিশ্রমের কাজ।
৩. নিয়ন্ত্রণ জটিলতা: পুকুরের তলদেশের সাইপ্রিনাস কার্প কাদা খুঁড়ে খাবার খোঁজে, যার ফলে অনেক সময় পুকুরের জল ঘোলা হয়ে যেতে পারে এবং বেশি কাদা খুঁড়লে পাড়ের ক্ষতি হতে পারে।
উপসংহার
সঠিক নিয়মে পুকুর প্রস্তুত করে এবং জলের স্তর অনুযায়ী দেশী ও বিদেশী কার্প মাছের এই অনুপাত বজায় রাখলে পুকুরে মিশ্র মাছ চাষ পদ্ধতি থেকে সবচেয়ে কম খরচে সর্বোচ্চ লাভ করা সম্ভব। শুধু লক্ষ্য রাখতে হবে নিয়মিত চুন-সার প্রয়োগ এবং মাছের ওজন অনুপাতে সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার ওপর।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর(FAQ)
প্রশ্ন ১: মিশ্র মাছ চাষ কাকে বলে?
উত্তর: পুকুরের বিভিন্ন স্তরের প্রাকৃতিক খাদ্যকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করার জন্য যখন একই পুকুরে কামড়াকামড়ি না করে একাধিক প্রজাতির (যেমন: রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প ইত্যাদি) মাছ একত্রে চাষ করা হয়, তাকে মিশ্র মাছ চাষ বলে।
প্রশ্ন ২: নিবিড় মাছ চাষ কাকে বলে?
উত্তর: অল্প জায়গায় বা ছোট পুকুরে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে, অধিক ঘনত্বে পোনা মজুত করে, নিয়মিত উচ্চ প্রোটিনযুক্ত কৃত্রিম খাবার এবং কৃত্রিমভাবে অক্সিজেনের (যেমন: অ্যারোটর) ব্যবস্থা করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কম সময়ে বেশি মাছ উৎপাদন করার পদ্ধতিকে নিবিড় মাছ চাষ বলে।
প্রশ্ন ৩: মাছের প্রধান খাদ্য কী?
উত্তর: পুকুরে মাছের প্রধান প্রাকৃতিক খাদ্য হলো জলের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উদ্ভিদকণা বা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (Phytoplankton) এবং প্রাণীকণা বা জুপ্ল্যাঙ্কটন (Zooplankton)। এছাড়া মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পরিপূরক বা কৃত্রিম খাদ্য হিসেবে সরষের খোল ও চালের কুঁড়ো সমহারে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
তথ্য সূত্র
- মৎস বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
- মৎস গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ সরকার।










