
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের কাছে অত্যন্ত লাভজনক এবং জনপ্রিয় একটি নাম হলো স্ট্রবেরি চাষ। স্ট্রবেরি মূলত নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের ফল হলেও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আমাদের এই অঞ্চলেও এর সফল চাষ হচ্ছে। এটি শুধু সুস্বাদু ফলই নয়, বরং খাদ্য, পানীয়, মিষ্টান্ন এবং প্রসাধনী শিল্পেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আজকের এই নিবন্ধে আমরা ( strawberry ) স্ট্রবেরি চাষ পদ্ধতি এবং এর খুঁটিনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. স্ট্রবেরি চাষের গুরুত্ব
স্ট্রবেরি চাষ একটি উচ্চমূল্যের ফসল। প্রথম দিকে চারা ও জমি তৈরিতে কিছুটা খরচ হলেও পরের বছর গুলোতে খরচ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এর সুগন্ধি এবং আকর্ষণীয় রঙের কারণে বাজারে এর দাম সবসময় ভালো থাকে। কৃষকরা অল্প জমিতে স্ট্রবেরি চাষ পদ্ধতি-তে খুব দ্রুত লাভবান হতে পারেন।
২. স্ট্রবেরি চাষের উপযুক্ত সময়
সফল ফলনের জন্য স্ট্রবেরি চাষের উপযুক্ত সময় জানা খুবই জরুরি। আমাদের এই অঞ্চলে সাধারণত শীতকালই স্ট্রবেরি চাষের জন্য সেরা সময়। চারা রোপণের আদর্শ সময় হলো সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাস। তবে জলবায়ু ভেদে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চারা লাগানো যেতে পারে। রোপনের ৩-৮ মাস পর থেকে ফল দেওয়া শুরু করে এবং ৫-৬ মাস পূর্ণ ক্ষমতায় ভাল ফলন দেয় ।
৩. উপযুক্ত পরিবেশ ও মাটি তৈরি
স্ট্রবেরি চাষের জন্য আবহাওয়া এবং মাটির সঠিক নির্বাচন অর্ধেক সফলতা এনে দেয়।
- মাটি: পিএইচ (pH) ৫.৭ থেকে ৬.৫ এর মধ্যে থাকা বেলে দোআঁশ থেকে দোআঁশ মাটি স্ট্রবেরি চাষের মাটি তৈরি করার জন্য আদর্শ।
- পরিবেশ: এটি মূলত নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর ফসল। উজ্জ্বল সূর্যালোক এবং ঠান্ডা আবহাওয়া স্ট্রবেরির মিষ্টতা বাড়াতে সাহায্য করে। স্ট্রবেরি চাষ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ-এর অধিকাংশ জেলাতেই এখন সফলভাবে করা সম্ভব হচ্ছে।
৪. স্ট্রবেরি চাষের আধুনিক পদ্ধতি
Strawberry চাষ পদ্ধতি সাধারণত দুইভাবে করা যায়—সরাসরি মাটিতে অথবা টবে। নিচে জমি প্রস্তুতির ধাপগুলো দেওয়া হলো:
a. উন্নত জাত নির্বাচন
ভারতে এবং বাংলাদেশে চাষের জন্য উল্লেখযোগ্য জাতগুলো হলো:
সেলভা, চ্যান্ডলার, টিওগা, বেলরুবি, টরে, ফার্ন এবং পাজারো। এছাড়াও রেড কস্ট, প্রিমিয়ার, ব্যাঙ্গালোর, পুসা আর্লি ডোয়ার্ফ এবং উইন্টার ডন’ বা নাবিলা এর মতো উন্নত জাতের টিস্যু কালচার চারা জাতগুলো বেশ জনপ্রিয়।
b. জমি প্রস্তুতি ও সার ব্যবস্থাপনা
স্ট্রবেরি চাষ পদ্ধতি-তে প্রথমে জমিটি ভালো করে চাষ দিয়ে নিতে হবে। মাটির ক্ষতিকারক জীবাণু ও শেকড়ের রোগ দমনে মিথাইল ব্রোমাইড এবং ক্লোরোপিক্রিনের মিশ্রণ দিয়ে মাটি শোধন করে নেওয়া ভালো।
- সার: বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ২৫ কুইন্টাল পচা গোবর সার দিতে হবে। এর সাথে এনপিকি (NPK) বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২০ কেজি হারে মাটিতে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে।
- মালচিং: বর্তমানে প্লাস্টিক মালচিং এবং ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি ব্যবহার করলে ফলন অনেক বেশি হয়। প্লাস্টিক ব্যবহারের ফলে আগাছা কম হয় এবং মাটিতে আর্দ্রতা বজায় থাকে।
c. চারা রোপণ ও দূরত্ব
স্ট্রবেরির চারা রোপণের সময় মনে রাখতে হবে যে এর মূল মাটির খুব গভীরে যায় না। সাধারণত চারা থেকে চারা ৩০ সেন্টিমিটার এবং সারি থেকে সারি ৪৫-৬০ সেন্টিমিটার দূরত্ব বজায় রেখে চারা রোপণ করতে হবে এবং এই দূরত্বে রোপণ করলে ৩৩ শতকে ১ বিঘা তে ৯০০০ চারা প্রয়োজন হবে। ভাইরাস মুক্ত চারার জন্য টিস্যুকালচার চারা বা সুস্থ রানার ব্যবহার করা উচিত।
৫. স্ট্রবেরি গাছের যত্ন ও ফলন বৃদ্ধি
স্ট্রবেরি গাছ খুব সংবেদনশীল, তাই এর বিশেষ পরিচর্যা প্রয়োজন স্ট্রবেরি চাষ পদ্ধতি-তে। এই গাছের মূল মাটির খুব গভীরে যায় না, তাই সঠিক উপায়ে জলের ব্যবস্থাপনা করা জরুরি।
- সেচ ব্যবস্থাপনা: স্ট্রবেরি গাছে নিয়মিত কিন্তু অল্প পরিমাণে সেচ দিতে হবে। ড্রিপ বা স্প্রিঙ্কলার পদ্ধতি এই চাষের জন্য সবথেকে ভালো। মনে রাখবেন, মাটিতে রস থাকা আবশ্যক কিন্তু জল জমে থাকলে গোড়া বা কাণ্ড পচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- মালচিং এর গুরুত্ব: চারা রোপণের পর খড় বা প্লাস্টিক দিয়ে মালচিং করে দিলে ফল মাটির সংস্পর্শে আসে না, ফলে ফল পচে যাওয়ার ভয় থাকে না।
- হরমোন প্রয়োগ ও ফলন বৃদ্ধি: ভালো ফলনের জন্য ফুল ফোটার ৪ দিন পর GA 3 (50 ppm.) স্প্রে করা যেতে পারে। এছাড়া ফুল আসার পর ম্যালিক হাইড্রাইজাইড (0.1-0.3%) স্প্রে করলে ফলন ৩১-৪১% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং ফলের আকার উন্নত করতে মোরফাকটিন (@50 ppm.) খুবই কার্যকরী।
৬. স্ট্রবেরি চাষ টবে: বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় চাষের নিয়ম
অনেকেই শখের বসে বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় চাষ করতে চান। স্ট্রবেরি চাষ টবে করার জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
- ১. ১০-১২ ইঞ্চির টব নির্বাচন করুন এবং তাতে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ছিদ্র রাখুন।
- ২. দোআঁশ মাটির সাথে সমপরিমাণ পচা গোবর বা ভার্মিকম্পোস্ট এবং সামান্য হাড়ের গুঁড়ো মিশিয়ে মাটি তৈরি করুন।
- ৩. টবের মাঝখানে চারা লাগিয়ে নিয়মিত রোদ ও পরিমিত জল দিন।
- ৪. টবের মাটিতেও খড় বা শুকনো পাতা দিয়ে মালচিং করুন যাতে ফলগুলো মাটির ছোঁয়া না পায়।
৭. স্ট্রবেরি গাছের রোগ ও পোকামাকড় দমন
সফলভাবে চাষ করতে হলে পোকামাকড় ও রোগ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে:
- পোকামাকড়: মূলত সাদা গ্রাব, কাটওয়ার্ম এবং লোমশ শুঁয়োপোকা স্ট্রবেরি গাছের ক্ষতি করে। প্রতিকার হিসেবে এন্ডোসালফান (০.০৫%) বা ম্যালাথিয়ন (০.০৫%) স্প্রে করা যেতে পারে।
- ছত্রাক আক্রমণ: পাতায় দাগ এবং ধূসর ছত্রাক দেখা দিলে কার্বেন্ডাজিম বা থায়োফেনেট মিথাইল প্রয়োগ করতে হবে।
- শারীরবৃত্তীয় ব্যাধি: জলবায়ুর তারতম্যের কারণে অনেক সময় ফলের রঙ ফ্যাকাসে বা সাদা হয়ে যায়। একে ফিজিক্যাল ডিসঅর্ডার বলে, যা আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে ঠিক হয়ে যায়।
৮. ফল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ
স্ট্রবেরি পাকার সময় খুব সাবধানে সংগ্রহ করতে হয়:
- সংগ্রহের সময়: ফলের রঙ যখন অর্ধেক বা তিন-চতুর্থাংশ লাল হবে, তখনই ফসল সংগ্রহ করুন। সাধারণত ২-৩ দিন পর পর খুব ভোরে ফল তোলা উচিত।
- সংরক্ষণ: ফল সংগ্রহের পর অতিরিক্ত তাপ থেকে বাঁচাতে ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখুন। কোল্ড স্টোরেজে ৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় ১০ দিন পর্যন্ত ফল ভালো রাখা সম্ভব।
- গ্রেডিং: ছোট ও বড় সাইজের ফলগুলো আলাদা করে (গ্রেডিং) প্যাকিং করলে বাজারে বেশি দাম পাওয়া যায়।
৯. স্ট্রবেরি উৎপাদন ও লাভের হিসাব
স্ট্রবেরি চাষ পদ্ধতি বর্তমানে একটি লাভজনক ব্যবসা। সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করলে খুব অল্প সময়ে বিনিয়োগের কয়েক গুণ টাকা আয় করা সম্ভব।
- উৎপাদন ক্ষমতা: জাত এবং পরিচর্যা ভেদে প্রতিটি স্ট্রবেরি গাছ থেকে গড়ে ৩০০ থেকে ৭০০ গ্রাম পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। অর্থাৎ, এক বিঘা জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে প্রায় ২,৫০০ থেকে ৪,০০০ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন সম্ভব।
- খরচ ও লাভ: এক বিঘা জমিতে চারা, সার, মালচিং এবং শ্রমিকের মজুরি বাবদ প্রায় ১.৫ থেকে ২ লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে। বর্তমান বাজারে স্ট্রবেরির পাইকারি দাম গড়ে ২০০-৩০০ টাকা প্রতি কেজি হলে, এক বিঘা জমি থেকে সর্বনিন্ম ৩০০০ কেজি উৎপাদন ২০০ টাকা কেজি বিক্রয় ধরলে খরচ বাদে ৪ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিট লাভ করা সম্ভব।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: স্ট্রবেরি চাষের উপযুক্ত সময় কোনটি?
উত্তর: স্ট্রবেরি চাষের আদর্শ সময় হলো শীতকাল। সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। তবে নভেম্বর মাস পর্যন্ত চারা লাগানো যেতে পারে।
প্রশ্ন ২: একটি স্ট্রবেরি গাছে কতবার ফল ধরে?
উত্তর: একটি সুস্থ স্ট্রবেরি গাছে তার জীবনচক্রে ২ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। তবে চারা রোপণের ৩-৪ মাস পর থেকে প্রথম ফলন শুরু হয় এবং তাপমাত্রা না বাড়া পর্যন্ত ফল ধরে।
প্রশ্ন ৩: স্ট্রবেরি চাষের জন্য কোন মাটি সবথেকে ভালো?
উত্তর: পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা আছে এমন বেলে-দোআঁশ মাটি স্ট্রবেরি চাষের জন্য সবথেকে উপযোগী। মাটির পিএইচ (pH) ৫.৫ থেকে ৬.৫ এর মধ্যে থাকলে ফলন সবথেকে ভালো হয়।
প্রশ্ন ৪: স্ট্রবেরি চারা কোথায় পাওয়া যায়?
অনেকেই জানতে চান স্ট্রবেরি চারা কোথায় পাওয়া যায়। সাধারণত সরকারি উদ্যানপালন দপ্তর (Horticulture Department), বড় নার্সারি বা টিস্যুকালচার ল্যাব থেকে উন্নত জাতের ভাইরাস মুক্ত চারা সংগ্রহ করা যায়। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষি মেলা থেকেও চারা সংগ্রহ করা সম্ভব।
তথ্য সূত্র
- ভারতীয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্র (ICAR)
- বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র (BARI)










