কৃষি প্রযুক্তি পরিচালন সংস্থা (ATMA) প্রকল্প গাইডলাইন:

আত্মা (ATMA) প্রকল্প কি: আত্মা (ATMA) প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও সুবিধাসমূহ.
আত্মা (ATMA) প্রকল্পের কৃষি কার্যকলাপের দৃশ্য।

আমাদের দেশের কৃষকদের সনাতন বা পুরোনো চাষ পদ্ধতির বদলে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও লাভজনক চাষের সাথে সরাসরি যুক্ত করতে ভারত সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রক একটি অত্যন্ত কার্যকরী প্রকল্প চালু রেখেছে। এই প্রকল্পটির নাম হলো ‘কৃষি প্রযুক্তি পরিচালন সংস্থা’ (Agricultural Technology Management Agency – ATMA) বা সংক্ষেপে ‘আত্মা’ প্রকল্প।

বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্যে সদর্থক ভূমিকায় প্রকল্পের প্রশাসনিক কাজ এবং জেলা ও ব্লক স্তরের কৃষি দপ্তরগুলির মধ্যে সমন্বয় অনেক উন্নত হয়েছে। ফলে কৃষকদের কাছে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও উন্নত ট্রেনিং পৌঁছানোর গতি আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

১. আত্মা (ATMA) প্রকল্প কি?

আত্মা (ATMA)-এর পুরো নাম হলো Agricultural Technology Management Agency (কৃষি প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা সংস্থা)। এটি ভারত সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের অধীনে পরিচালিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জেলা-ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা।

সহজ কথায়, এটি এমন একটি সরকারি প্রকল্প যা গবেষণাগারের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, নতুন চাষ পদ্ধতি এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সরাসরি সাধারণ কৃষকদের জমিতে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার সেতু হিসেবে কাজ করে।

আত্মা (ATMA) প্রকল্প সম্পর্কে কয়েকটি মূল বিষয় নিচে দেওয়া হলো:

১.১. সাংগঠনিক কাঠামো

  • জেলা স্তরে পরিচালনা: এটি কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় স্তরের প্রথাগত দপ্তর নয়, বরং প্রতিটি জেলায় এটি একটি রেজিস্টার্ড সোসাইটি বা সংস্থা হিসেবে কাজ করে। এর ফলে জেলার নিজস্ব ভৌগোলিক ও জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
  • তৃণমূল স্তরের সংযোগ: জেলা স্তরের পাশাপাশি প্রতিটি ব্লকে এই প্রকল্পের কাজ পরিচালনার জন্য FIAC (Farm Information Advisory Centre) থাকে এবং সেখানে ব্লক টেকনোলজি ম্যানেজার (BTM) ও অ্যাসিস্ট্যান্ট টেকনোলজি ম্যানেজার (ATM) নিয়োজিত থাকেন।

১.২ বহুমাত্রিক সমন্বয়

চিরাচরিত নিয়মে কৃষি, পশুপালন বা মৎস্য চাষের দপ্তরগুলো আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে। কিন্তু আত্মা (ATMA) প্রকল্প এই সবগুলোকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসে:

  • কৃষি : খাদ্যশস্য উৎপাদন ও আধুনিক প্রযুক্তি।
  • উদ্যানপালন: ফল, ফুল ও শাকসবজি চাষ।
  • শুপালন ও দুগ্ধ চাষ: গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালন।
  • মৎস্য চাষ: মাছ চাষ ও জলজ সম্পদ উন্নয়ন।
  • রেশম চাষ: রেশম গুঁটি ও সুতো উৎপাদন।
  • মৌমাছি পালন: বৈজ্ঞানিক উপায়ে মধু উৎপাদন এবং পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের ফলন বৃদ্ধি।

আড়ও দেখুন কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (KCC) ঋণ: KCC ঋণ সুবিধা, লিমিট ও আবেদন পদ্ধতি

২. আত্মা (ATMA) প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

আত্মা (ATMA) প্রকল্প বা কৃষি প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা সংস্থা হলো ভারতের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের অধীনে পরিচালিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। জেলা স্তরে কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, আধুনিকীকরণ এবং কৃষকদের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এই প্রকল্প কাজ করে।

নিচে আত্মা (ATMA) প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

২.১ আত্মা (ATMA) প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যসমূহ

  • কৃষি প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ: গবেষণাগারে আবিষ্কৃত আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও উন্নত চাষের পদ্ধতি যাতে দ্রুত এবং সরাসরি সাধারণ কৃষকদের জমিতে পৌঁছে দেওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করা।
  • কৃষক-কেন্দ্রিক পরিকাঠামো গঠন: প্রথাগত উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থার পরিবর্তে, মাঠপর্যায়ের কৃষকদের প্রকৃত চাহিদা ও সমস্যার ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা তৈরি করা।
  • যৌথ সমন্বয় সাধন: কৃষি, উদ্যানপালন (Horticulture), পশুপালন , মৎস্য চাষ এবং রেশম চাষের মতো বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে কৃষকদের এক ছাতার তলায় সব পরিষেবা দেওয়া।
  • কৃষক গোষ্ঠী তৈরি: স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHG), ফার্মার্স ইন্টারেস্ট গ্রুপ (FIG) এবং প্রডিউসার গ্রুপ (PG) গঠনের মাধ্যমে কৃষকদের সংঘবদ্ধ করা, যাতে তারা যৌথভাবে চাষ ও বিপণনের সুবিধা পেতে পারেন।
  • বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি: কৃষি প্রযুক্তির প্রসারে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, ইনপুট ডিলার এবং এনজিও (NGO)-দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

২.২ আত্মা (ATMA) প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্যসমূহ

  • কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি: উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, সফল খামার পরিদর্শনের জন্য রাজ্য ও আন্তঃরাজ্য শিক্ষা সফরের (Exposure Visit) আয়োজন করা এবং মাঠ পর্যায়ে প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকদের দক্ষ করে তোলা।
  • মহিলা কৃষকদের ক্ষমতায়ন: কৃষি কাজে যুক্ত মহিলা দিদিদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং প্রতিটি ব্লকে মহিলা কৃষক গোষ্ঠী তৈরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া।
  • তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার: মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস (SMS) এবং কিষান কল সেন্টারের মাধ্যমে আবহাওয়া, বাজারের দর ও ফসলের রোগ-পোকা দমনের সঠিক তথ্য সময়মতো কৃষকের কাছে পৌঁছানো।
  • কৃষক-বিজ্ঞানী সেতুবন্ধন: কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র (KVK) এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সরাসরি কৃষকদের ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে মাঠপর্যায়ের সমস্যার তাৎক্ষণিক বৈজ্ঞানিক সমাধান নিশ্চিত করা।
  • স্থায়ী ও লাভজনক কৃষি: রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে সমন্বিত চাষ পদ্ধতি (Integrated Farming) এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির মাধ্যমে চাষের খরচ কমানো ও কৃষকদের নিট আয় বৃদ্ধি করা।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, আত্মা (ATMA) প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো চিরাচরিত কৃষিকে একটি লাভজনক ও আধুনিক ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তরিত করা, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী নেওয়া হয়।

৩. কৃষকদের জন্য ATMA প্রকল্পের মূল সুবিধাসমূহ

আত্মা (ATMA) প্রকল্পের মাধ্যমে ব্লক এবং জেলা স্তরের কৃষকেরা সরাসরি নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। এই প্রকল্পের মূল সুবিধাসমূহ নিচে বিস্তারিতভাবে সাজিয়ে দেওয়া হলো:

৩.১. কৃষকদের জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধাসমূহ

  • বিনামূল্যে আধুনিক প্রশিক্ষণ: কৃষকদের চাষের আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত বীজ তৈরি, জৈব চাষ এবং সমন্বিত কৃষি পদ্ধতির ওপর জেলা ও ব্লক স্তরে বিনামূল্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
  • শিক্ষা সফর বা এক্সপোজার ভিজিট: উন্নত চাষপদ্ধতি নিজ চোখে দেখার জন্য কৃষকদের রাজ্যের ভেতরে কিংবা অন্য রাজ্যের বিভিন্ন উন্নত খামার, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রে (KVK) সরকারি খরচে শিক্ষামূলক সফরে নিয়ে যাওয়া হয়।
  • মাঠপর্যায়ে প্রদর্শনী: নতুন কোনো প্রযুক্তি বা ফসলের জাত কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় করতে বাছাইকৃত কৃষকদের জমিতে সরকারি সহায়তায় প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, সার বা উপকরণ প্রকল্প থেকে দেওয়া হয়।
  • কৃষক পুরস্কার ও স্বীকৃতি: ব্লক ও জেলা স্তরে যেসব কৃষক নতুন কোনো পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন বা রেকর্ড ফলন করেন, তাঁদের উৎসাহিত করতে “সেরা কৃষক পুরস্কার” এবং আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়।

৩.২. প্রাতিষ্ঠানিক ও গোষ্ঠীগত সুবিধাসমূহ

  • কৃষক গোষ্ঠী (FIG/PG) গঠনে সহায়তা: কৃষকদের দলগতভাবে শক্তিশালী করতে ফার্মার্স ইন্টারেস্ট গ্রুপ (FIG) এবং প্রডিউসার গ্রুপ (PG) তৈরিতে সাহায্য করা হয়। এই গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব তহবিল গঠনে এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া হয়।
  • মহিলা কৃষকদের বিশেষ অগ্রাধিকার: কৃষি কাজে যুক্ত গ্রামীণ মহিলাদের (মহিলা কিষাণ) দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কিট প্রদান করা হয়, যা তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
  • বিজ্ঞানীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সুবিধা: এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকেরা সরাসরি কৃষি বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের নিজেদের জমিতে এনে মাটির সমস্যা বা ফসলের রোগ-পোকা দমনের তাৎক্ষণিক ও সঠিক বৈজ্ঞানিক পরামর্শ পেয়ে থাকেন।

৩.৩. তথ্য ও বিপণন সংক্রান্ত সুবিধাসমূহ

  • ডিজিটাল তথ্য সেবা: আবহাওয়া, ফসলের রোগবালাইয়ের পূর্বাভাস এবং নিকটবর্তী বাজারের দর সংক্রান্ত সঠিক তথ্য কিসান কল সেন্টার বা মোবাইলের মাধ্যমে দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
  • কৃষি মেলার আয়োজন: জেলা ও ব্লক স্তরে কৃষি মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত ফসল প্রদর্শন ও বিক্রি করতে পারেন এবং উন্নতমানের কৃষি প্রযুক্তির স্টল থেকে সরাসরি জ্ঞান অর্জন করতে পারেন।

সংক্ষেপে, আত্মা (ATMA) প্রকল্পে একজন সাধারণ কৃষককে শুধু সনাতনী চাষী থেকে একজন প্রযুক্তি-নির্ভর এবং লাভজনক আধুনিক কৃষকে রূপান্তরিত করার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে।

৪. ফার্ম স্কুল (Farm School):

আত্মা (ATMA) প্রকল্পের একটি অন্যতম ও সবচেয়ে আকর্ষণীয় পয়েন্ট হলো ‘ফার্ম স্কুল’। এটি কোনো চার দেয়ালের বন্ধ স্কুল নয়, এটি হলো মাঠের স্কুল। কৃষকের জমিতেই প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষা দেওয়া হয়।

  • কার জমিতে হয়: এলাকার একজন প্রগতিশীল বা সফল কৃষকের জমিতেই এই ফার্ম স্কুল স্থাপন করা হয়। সেই সফল কৃষকই হন ওই স্কুলের ‘আচার্য কৃষক’ বা ট্রেইনার।
  • শিক্ষার পদ্ধতি: একটি নির্দিষ্ট ফসলের বীজ বোনা থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত সম্পূর্ণ মরসুমে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিক্যাল বা হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়।
  • সুবিধা: প্রতি ব্লকে প্রতি বছর একাধিক ফার্ম স্কুল চালানো হয়, যেখানে ২০ থেকে ২৫ জন স্থানীয় কৃষক একসাথে কোনো নির্দিষ্ট ফসলের রোগপোকা দমন এবং ফলন বাড়ানোর আধুনিক উপায় লাইভ শিখতে পারেন।

৫. কৃষক গোষ্ঠী বা FIG (Farmer Interest Group) গঠন

আত্মা (ATMA) প্রকল্পের নীতি অনুযায়ী একক কোনো কৃষকের চেয়ে দলগত বা গোষ্ঠীগত ভাবে চাষবাস করলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা অনেক বেশি মাত্রায় পৌঁছানো যায়। এই লক্ষ্যে ATMA প্রকল্পের অধীনে তৈরি করা হয়:

  • FIG (কৃষক স্বার্থ গোষ্ঠী): একটি গ্রামে বা এলাকায় একই ধরণের চাষে আগ্রহী (যেমন- সবজি চাষ, মাশরুম চাষ বা ফুল চাষ) ১০ থেকে ২০ জন কৃষককে নিয়ে একটি দল বা গ্রুপ তৈরি করা হয়।
  • FSG (কৃষক সহায়তা গোষ্ঠী): একইভাবে গ্রামীণ মহিলাদের স্বনির্ভর করতে এবং কৃষিকাজে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়াতে মহিলা কৃষকদের নিয়ে বিশেষ দল গঠন করা হয়।
  • গোষ্ঠীগত সুবিধা: এই দলগুলি নিবন্ধিত হওয়ার পর সরাসরি সরকারি বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ পায়। এছাড়া গোষ্ঠীগতভাবে ব্যবসা, ফসল বিপণন (Marketing) বা ছোট কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ATMA ফান্ড থেকে বিশেষ আর্থিক অনুদান বা ঘূর্ণায়মান তহবিল (Revolving Fund) দেওয়া হয়।

আড়ও দেখুন FPO কি ? FPO গঠন ও কার্যাবলী গাইড: কৃষক উৎপাদক সংস্থা রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি

৬. প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা

ভারতের এবং বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো প্রকৃত কৃষিজীবী মানুষ আত্মা (ATMA) প্রকল্পের সাথে যুক্ত হতে পারেন। ATMA প্রকল্পের নিয়মে যোগ্যতার শর্তগুলি অত্যন্ত শিথিল রাখা হয়েছে:

  • কৃষকের ধরণ: আপনি ক্ষুদ্র, প্রান্তিক কিংবা বড় কৃষক—যেকোনো স্তরের চাষী হলেই এই প্রকল্পের প্রশিক্ষণ ও ভ্রমণের সুবিধা পাবেন।
  • মহিলা কৃষক ও যুব সমাজ: গ্রামীণ মহিলা এবং কৃষিকাজে আসতে চাওয়া বেকার যুবকদের এই প্রকল্পে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
  • জমির সীমা: এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার জন্য নিজস্ব নামে বিপুল পরিমাণ জমি থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এমনকি লিজ নেওয়া জমি বা ভাগচাষীরাও কৃষি গোষ্ঠীর সদস্য হয়ে সুবিধা নিতে পারেন।
  • অন্যান্য ক্ষেত্র: শুধু প্রথাগত ধান-গম চাষী নয়; পশুপালক, মৎস্য চাষী, দুগ্ধ খামারী এবং মৌমাছি পালনকারীরাও এই প্রকল্পের সমান অংশীদার।

৭. আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র

ব্লক কৃষি অফিসে আত্মা (ATMA) প্রকল্পের সুবিধা বা প্রশিক্ষণের জন্য নাম নথিভুক্ত করতে নিচে দেওয়া সাধারণ কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়:

  • ১. পরিচয়পত্র: আবেদনকারী কৃষকের আধার কার্ডের জেরক্স। (ফর্ম বা রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে এটি পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত হবে, তবে সুরক্ষার স্বার্থে কোনো গোপন নম্বর কোথাও প্রকাশ করা হবে না)।
  • ২. ভোটার কার্ড: কৃষকের বৈধ ভোটার আইডি।
  • ৩. জমির বিবরণ: কৃষকের নিজস্ব জমির পর্চা/খতিয়ান অথবা তিনি যে চাষের সাথে যুক্ত তার একটি সাধারণ প্রমাণ বা পঞ্চায়েতের শংসাপত্র।
  • ৪. ব্যাংক পাসবই: যদি কোনো প্রদর্শনী ক্ষেত্র বা গোষ্ঠীগত অনুদানের বিষয় থাকে, তবে কৃষকের নিজস্ব আধার-লিঙ্কড ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পাসবইয়ের প্রথম পাতার জেরক্স লাগবে।
  • ৫. সচল মোবাইল নম্বর: প্রশিক্ষণের দিনক্ষণ ও কিষাণ মেলার আপডেট সরাসরি ফোনে পাওয়ার জন্য একটি স্থায়ী মোবাইল নম্বর।

৮. কীভাবে কৃষকেরা ATMA প্রকল্পের সাথে যুক্ত হবেন?

আত্মা (ATMA) প্রকল্পের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ব্লক স্তরের কৃষি অফিসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর জন্য কোনো অনলাইন ফর্ম ফিল-আপের ঝামেলা নেই। কৃষকদের নিচে দেওয়া পদ্ধতিতে যোগাযোগ করতে হবে:

১. কৃষি প্রযুক্তি সহায়ক (KPS): আপনার গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে কর্মরত কৃষি প্রযুক্তি সহায়কের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করুন। তিনিই প্রথম আপনার নাম প্রশিক্ষণের জন্য ব্লক অফিসে সুপারিশ করবেন।

২. ব্লক সহ-কৃষি অধিকর্তার কার্যালয় (ADA Office): সরাসরি আপনার ব্লকের কৃষি অফিসে গিয়ে ATMA প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের সাথে দেখা করতে পারেন।

৩. বিটিএম (BTM) এবং এটিএম (ATM): ATMA গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি ব্লকে এই প্রকল্পের কাজ দেখাশোনার জন্য বিশেষ টেকনিক্যাল অফিসার থাকেন:

  • BTM (Block Technology Manager): তিনি ব্লকের পুরো ATMA প্রকল্পের ম্যানেজার বা প্রধান সমন্বয়কারী।
  • ATM (Assistant Technology Manager): তিনি মাঠ স্তরে কৃষকদের কাছে গিয়ে আধুনিক চাষের টেকনিক্যাল গাইডলাইন দিয়ে সাহায্য করেন।

কৃষকেরা ব্লকের ADA অফিসে গিয়ে সরাসরি এই বিটিএম বা এটিএম স্যারদের সাথে দেখা করে ফার্ম স্কুল বা কৃষি ভ্রমণের জন্য নাম নথিভুক্ত করতে পারেন।

আড়ও দেখুন প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি (PM-KISAN) সম্পূর্ণ গাইডলাইন ও আবেদন নিয়ম

৯. সাধারণ সমস্যা এবং তার সঠিক সমাধান

অনেক সময় প্রদর্শনী ক্ষেত্রের অনুদান বা কৃষক গোষ্ঠীর (FIG) ঘূর্ণায়মান তহবিল (Revolving Fund) পেতে কৃষকদের সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে সমাধানগুলি নিচে দেওয়া হলো:

  • ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ডিবিটি সমস্যা: যদি কোনো প্রদর্শনী চাষের জন্য ইনপুট বা ক্যাশ সাপোর্ট সরাসরি অ্যাকাউন্টে আসার কথা থাকে এবং তা না আসে, তবে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে DBT (Direct Benefit Transfer) সচল আছে কিনা তা ব্যাংকে গিয়ে চেক করুন।
  • নাম নথিভুক্তিকরণে সমস্যা: যদি কোনো মরসুমে আপনার নাম ট্রেনিং বা ভ্রমণের তালিকায় না ও ওঠে, তবে আপনার এলাকার ‘কৃষক গোষ্ঠী’র মাধ্যমে দলগতভাবে ব্লকের BTM-এর কাছে লিখিত আবেদন জমা দিন। গোষ্ঠীগত আবেদনকে আত্মা (ATMA) প্রকল্পে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন: ATMA প্রকল্পের কোনো প্রশিক্ষণে অংশ নিলে কি কৃষকদের কোনো টাকা বা ভাতা দেওয়া হয়?

উত্তর: আত্মা (ATMA) প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার জন্য কোনো সরাসরি নগদ টাকা বা দৈনিক ভাতা দেওয়া হয় না। তবে প্রশিক্ষণ চলাকালীন কৃষকদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দুপুরের খাবার, টিফিন, উন্নত বীজ বা সার (প্রশিক্ষণ কিট হিসেবে) এবং স্টাডি মেটেরিয়াল দেওয়া হয়। এছাড়া কৃষি ভ্রমণের (Exposure Visit) ক্ষেত্রে যাতায়াত ও থাকার সমস্ত খরচ সম্পূর্ণ সরকারি তহবিল থেকে বহন করা হয়।

প্রশ্ন: আমি কি একই সাথে PM-KISAN, কৃষক বন্ধু এবং ATMA—তিনটি প্রকল্পের সুবিধাই নিতে পারি?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই। পিএম কিষাণ এবং কৃষক বন্ধু হলো কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রকল্প। আর ATMA হলো কৃষকদের আধুনিক চাষের ট্রেনিং ও কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার সংস্থা। তাই আপনি আর্থিক সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি নিজের চাষের উন্নতির জন্য ATMA প্রকল্পের ফার্ম স্কুল বা প্রশিক্ষণে অনায়াসে অংশ নিতে পারবেন।

আত্মা (ATMA) প্রকল্পের বৈশিষ্ট্য কি?

ATMA প্রকল্প কৃষি, পশুপালন, মৎস্য ও মৌমাছি পালনের মতো সমস্ত আলাদা দপ্তরকে এক ছাতার তলায় এনে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করে। এটি উপর থেকে সিদ্ধান্ত না চাপিয়ে, তৃণমূল স্তরের কৃষকদের প্রকৃত সমস্যা ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে জেলা ও ব্লক স্তরে নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করে। এছাড়াও, এটি বিনামূল্যে আধুনিক চাষের প্রশিক্ষণ, অন্য রাজ্যে শিক্ষা সফর ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সরাসরি কৃষকের জমিতে পৌঁছে দেয়।

তথ্য সূত্র

  • Department of Agriculture & Farmers Welfare, Government of India এবং MANAGE – Extension Reforms.
Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top