
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৃষক দরদী প্রকল্প হলো বাংলা শস্য বীমা যোজনা (BSB)। এই যোজনার মূল লক্ষ্য হলো খরা, বন্যা, পোকার আক্রমণ কিংবা জমিতে সেচের পানির অভাবজনিত কারণে ফসলের ক্ষতি হলে কৃষকদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আর্থিক সুরক্ষা প্রদান করা। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৬ সালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী এই বিমার সুবিধা, যোগ্যতা এবং অনলাইন ও অফলাইন আবেদন সহজ পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
এক নজরে: বাংলা শস্য বীমা যোজনা (BSB) ২০২৬
| বিষয় | অতি সংক্ষেপে তথ্য |
|---|---|
| প্রকল্পের নাম | Bangla Shasya Bima Yojana (বাংলা শস্য বিমা যোজনা) |
| মূল উদ্দেশ্য | প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি হলে কৃষকদের নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া। |
| আবেদনের খরচ | কৃষকদের জন্য ১০০% বিনামূল্যে (বিমার প্রিমিয়ামের পুরো টাকা রাজ্য সরকার দেয়)। |
| কারা আবেদনযোগ্য | পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত ক্ষুদ্র, প্রান্তিক এবং ভাগ চাষিরা। |
| আবেদনের মাধ্যম | অনলাইন (অফিসিয়াল পোর্টাল) এবং অফলাইন (কৃষি অফিস বা দুয়ারে সরকার)। |
| অফিসিয়াল সাইট | banglashasyabima.net |
| বীমা কোম্পানী | SBI General Insurance Company Limited |
আড়ও জানতে ক্লিক করুন – প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা (PMFBY) ২০২৬: ফর্ম ফিলাপ ও ক্ষতিপূরণের নিয়ম
বাংলা শস্য বীমা যোজনা (BSB)র প্রধান সুবিধা ও যোগ্যতা
প্রধান সুবিধাসমূহ:
বিনামূল্যে বিমা: বাণিজ্যিক ফসল (যেমন আলু ও আখ) বাদে অন্য সব প্রধান ফসলের বিমার প্রিমিয়াম রাজ্য সরকার নিজেই বহন করে।
সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা: খরা, অতিবৃষ্টি বা সেচের জলের তীব্র সংকটে ফসল নষ্ট হলে ক্ষয়ক্ষতির টাকা সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়।
আবেদনের যোগ্যতা:
আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা এবং একজন কৃষক (নিজস্ব জমি বা ভাগ চাষি) হতে হবে।
যে জমিতে চাষ হচ্ছে, সেই জমির বৈধ খতিয়ান, পর্চা বা ভাগ চাষের শংসাপত্র থাকতে হবে।
বাংলা শস্য বীমা যোজনা আবেদনের নিয়ম ও নথিপত্র
- ১. ভোটার আইডি (EPIC) কার্ড।
- ২. জমির বর্তমান খতিয়ান/পর্চা (ভাগ চাষিদের জন্য নির্দিষ্ট ঘোষণাপত্র)।
- ৩. ব্যাংক পাসবইয়ের জেরক্স (যেখানে IFSC কোড ও অ্যাকাউন্ট নম্বর স্পষ্ট আছে)।
- ৪. কৃষকের নিজস্ব সচল মোবাইল নম্বর।
বাংলা শস্য বীমা যোজনা অনলাইন আবেদন পদ্ধতি
অনলাইনে নিজের মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে আবেদন করার সহজ ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
ধাপ ১: প্রথমে বাংলা শস্য বিমা যোজনার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন করতে নিচের নীল বোতাম টি তে ক্লিক করুন।
- ধাপ ২: এবার আপনার সচল মোবাইল নম্বরটি দিয়ে ওটিপি (OTP) ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন।
- ধাপ ৩: স্ক্রিনে আবেদন ফর্মটি খুললে আপনার নাম, জমির বিবরণ, ফসলের নাম এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য সঠিকভাবে টাইপ করুন।
- ধাপ ৪: প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র (জমির পর্চা, ভোটার কার্ড ও ব্যাংক পাসবই) স্ক্যান করে আপলোড করুন।
- ধাপ ৫: সব তথ্য মিলিয়ে নেওয়ার পর নিচে থাকা “Submit” বোতামে ক্লিক করুন। আবেদন সফল হলে একটি অ্যাপ্লিকেশন আইডি (Application ID) পাবেন, সেটি যত্ন করে রেখে দিন।
আড়ও জানতে ক্লিক করুন- প্রধানমন্ত্রী কিষান সন্মান নিধি যোজনার নিয়ম ও কি কি ডকুমেন্ট লাগে?
শস্য বীমা যোজনা ফরম ফিলাপ ২০২৬
যারা অনলাইনে বাংলা ফসল বীমা যোজনা আবেদন করতে পারবেন না, তারা অফলাইনে খুব সহজে আবেদন করতে পারেন:
- ধাপ ১: আপনার নিকটবর্তী ব্লক সহ-কৃষি অধিকর্তার অফিস (ADA Office), গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস অথবা ‘দুয়ারে সরকার’ ক্যাম্প থেকে এই যোজনার নির্দিষ্ট আবেদন ফর্মটি বিনামূল্যে সংগ্রহ করুন।
- ধাপ ২: ফর্মে কৃষকের ব্যক্তিগত তথ্য, চাষের জমির খতিয়ান/দাগ নম্বর এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ স্পষ্ট অক্ষরে লিখুন।
- ধাপ ৩: ফর্মের সাথে আপনার ভোটার কার্ড, জমির পর্চা এবং ব্যাংক পাসবইয়ের জেরক্স কপি একসাথে যুক্ত (Attatched) করুন।
- ধাপ ৪: সম্পূর্ণ ফিলাপ করা ফর্মটি আপনার ব্লগের কৃষি অফিসে (ADA Office) অথবা দুয়ারে সরকার ক্যাম্পে গিয়ে জমা দিন এবং সেখান থেকে অবশ্যই প্রাপ্তি স্বীকার রসিদ (Acknowledgement Slip) বুঝে নিন।
বাংলা শস্য বিমা যোজনা (BSB) ক্লেইম প্রসেস
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে কৃষকেরা কীভাবে ক্ষতিপূরণ বা ক্লেইম (Claim) পাবেন, তার সম্পূর্ণ প্রসেস নিচে দেওয়া হলো:
ধাপ ১: ফসলের ক্ষতি নির্ধারণ
বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি বা জমিতে সেচের পানির তীব্র সংকটের কারণে ফসল নষ্ট হলে, রাজ্য সরকারের কৃষি বিভাগ এবং বিমা কোম্পানি যৌথভাবে ওই এলাকার ফসলের ক্ষয়ক্ষতি খতিয়ে দেখে। একে ‘ক্রপ কাটিং এক্সপেরিমেন্ট’ (Crop Cutting Experiment)-ও বলা হয়।
ধাপ ২: উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট দ্বারা সার্ভে
উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে উপগ্রহের মাধ্যমে আক্রান্ত চাষের জমির ছবি এবং ডেটা যাচাই করা হয়। জমিতে ঠিকমতো পানি না পাওয়ার কারণে ফসল শুকিয়ে গেছে কি না, তাও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্র্যাক করা হয়।
ধাপ ৩: ক্লেইম স্ট্যাটাস চেক
কৃষকেরা নিজেদের বিমার আবেদনের স্ট্যাটাস সরাসরি অফিশিয়াল পোর্টালে গিয়ে চেক করতে পারেন। নিচে স্ট্যাটাস চেক সহজ পদ্ধতি দেওয়া হয়েছে।
ধাপ ৪: সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা
ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট চূড়ান্ত হওয়ার পর, কৃষকদের কোনো বাড়তি ঝক্কি পোহাতে হয় না। ক্লেইমের টাকা সরাসরি কৃষকের রেজিস্টার্ড ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (DBT-এর মাধ্যমে) পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
বাংলা শস্য বিমা যোজনা স্ট্যাটাস চেক ২০২৬
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সেচের জলের অভাবে আপনার ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে, তার বিমার টাকা কোন অবস্থায় আছে তা সরাসরি নিচের লিংকের বোতামে ক্লিক করে জেনে নিতে পারেন:
ধাপ ১: সরাসরি অফিশিয়াল চেক পেজে যান
নিচের দেওয়া লিংকের বোতামটিতে সরাসরি ক্লিক করুন। এটি আপনাকে কোনো বাড়তি পেজে না নিয়ে সোজা স্ট্যাটাস চেকিং পোর্টালে পৌঁছে দেবে:
ধাপ ২: অ্যাপ্লিকেশন আইডি (Application ID) দিন
লিংকটি খোলার পর স্ক্রিনে যে বক্সটি আসবে, সেখানে আপনার ফর্ম জমা দেওয়ার সময় পাওয়া নির্দিষ্ট Application ID (আবেদন নম্বর) টি সঠিকভাবে টাইপ করুন।
ধাপ ৩: মরশুম (Season) ও বছর (Year) বেছে নিন
ভোটার নম্বর দেওয়া হয়ে গেলে, নিচের ড্রপ-ডাউন মেনু থেকে আপনি যে মরশুমের ফসলের স্ট্যাটাস দেখতে চান (যেমন: রবি বা খরিফ) এবং বছরটি (যেমন: ২০২৬) সিলেক্ট করুন।
ধাপ ৪: সার্চ (Search) বোতামে ক্লিক করুন
সবশেষে ডানপাশে থাকা “Search” বোতামটির ওপর ক্লিক করলেই আপনার আবেদনের বর্তমান স্থিতি (Status) এবং ক্লেইমের টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হয়েছে কি না তা লাইভ দেখতে পাবেন বা কি অবস্থায় আছে জানতে পারবেন।
আড়ও জানতে ক্লিক করুন – কৃষক বন্ধু প্রকল্পের স্ট্যাটাস চেক কিভাবে করবেন।
বাংলা শস্য বিমা যোজনা ভরতুকি প্রদান নিয়ম
এই যোজনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ভরতুকি বা সাবসিডি প্রসেস, যা কৃষকদের বড় আর্থিক স্বস্তি দেয়:
১০০% সরকারি ভরতুকি:
সাধারণত যেকোনো বিমা করতে গেলে প্রিমিয়ামের টাকা গ্রাহককে দিতে হয়। কিন্তু বাংলা শস্য বিমা যোজনায় খরিফ ও রবি মরশুমের প্রধান ফসলগুলোর (যেমন: ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদি) বিমা প্রিমিয়ামের ১০০% টাকা পশ্চিমবঙ্গ সরকার ভরতুকি হিসেবে বিমা কোম্পানিকে দিয়ে দেয়। অর্থাৎ কৃষকদের পকেট থেকে ১ টাকাও প্রিমিয়াম দিতে হয় না, তারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই বিমার সুরক্ষা পান।
বাণিজ্যিক ফসলের ক্ষেত্রে আংশিক ভরতুকি:
আলু বা আখের মতো বাণিজ্যিক ফসলের ক্ষেত্রে প্রিমিয়ামের একটি অত্যন্ত সামান্য অংশ (মাত্র ৪.৮৫%) কৃষককে দিতে হয়, আর বাকি সিংহভাগ টাকাই রাজ্য সরকার ভরতুকি বা সাবসিডি হিসেবে বহন করে।
সাবসিডি বা ভর্তুকি সম্পর্কিত অভিযোগ
বাংলা শস্য বীমা বা বাংলা ফসল বীমা যোজনার ক্ষতিপূরণ আবেদন করতে ও পেতে অসুবিধা হলে SBI General Insurance Company Limited টোল ফ্রী নম্বরে ফোন করতে নিচের নম্বরে ক্লিক করতে পারেন।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: বাংলা শস্য বীমা যোজনা বা প্রকল্প কী?
উত্তর: বাংলা শস্য বীমা (BSB) হলো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ফসল বিমা প্রকল্প। খরা, বন্যা, অতিবৃষ্টি, পোকার আক্রমণ কিংবা সেচের পানির তীব্র সংকটের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকের ফসলের ক্ষতি হলে, এই যোজনার মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা বিমার টাকা দেওয়া হয়। এই প্রকল্পে কৃষকদের কোনো প্রিমিয়াম দিতে হয় না, সম্পূর্ণ খরচ রাজ্য সরকার বহন করে।
প্রশ্ন ২: শস্য বীমা স্ট্যাটাস চেক কী?
উত্তর: শস্য বীমা স্ট্যাটাস চেক হলো একটি অনলাইন পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কৃষকেরা ঘরে বসেই জানতে পারেন তাদের জমা দেওয়া বিমার আবেদনের বর্তমান অবস্থা কী। অফিশিয়াল পোর্টালে গিয়ে নিজের Application ID দিয়ে সার্চ করলে আবেদনটি অনুমোদিত (Approved) হয়েছে কি না, নাকি কোনো কারণে বাতিল (Rejected) হয়েছে, অথবা বিমার ক্লেইম করা টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে (Claim Disbursed) কি না তা লাইভ দেখা যায়।










