
ভারত ও বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে আখের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আধুনিক পদ্ধতিতে আখ চাষ করে কৃষকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি লাভবান হচ্ছেন। উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে বর্তমানে স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে আখের ব্যাপক ফলন হচ্ছে। সঠিক আখ চাষ পদ্ধতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জানলে আপনিও আখের বাম্পার ফলন পেতে পারেন।
১. ভারতে আখ চাষের বর্তমান পরিস্থিতি ও গুরুত্ব
আখ মূলত বৃষ্টিপাত এবং জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে চাষ করা হয়। গত ২০২০-২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশেই ২৭.৪০ লক্ষ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে, যেখানে ফলন ছিল প্রায় ২২.৩২ কোটি টন। বর্তমানে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কৃষকরা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে আরও স্মার্টভাবে আধুনিক পদ্ধতিতে আখ চাষ করছেন। ভারতে আখ উৎপাদন অঞ্চলকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
- ক) উপক্রান্তীয় অঞ্চল: উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব ও বিহার। এখানকার বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১৮০ থেকে ২০০০ মিলিমিটার। মোট উৎপাদনের প্রায় ৪৫-৫৫% এখান থেকেই আসে।
- খ) ক্রান্তীয় অঞ্চল: মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশ। এখানকার গড় বৃষ্টিপাত ৬৫০ থেকে ৩৬০০ মিলিমিটার। এই অঞ্চলেও দেশের মোট উৎপাদনের বড় একটি অংশ উৎপাদিত হয়।
- পশ্চিমবঙ্গে আখ চাষ: পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জলবায়ু অঞ্চলের আবহাওয়া আখ চাষের জন্য অনুকূল। নদীয়া জেলার বেথুয়াডহরিতে আখের গবেষণাগার রয়েছে, যারা চাষিদের প্রতিনিয়ত উন্নত চাষ পদ্ধতি ও উন্নত জাতের বীজ দিয়ে সহযোগিতা করে থাকেন।
আড়ও দেখুন আধুনিক পদ্ধতিতে পেঁপে চাষ ও সঠিক চারা উৎপাদন নির্দেশিকা
২. আখ চাষের উপযুক্ত পরিবেশ
সফল ফলনের জন্য আখ চাষের অনুকূল পরিবেশ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি।
- আঁখ চাষের মাটি: পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা আছে এমন ভারী মাটি আখ চাষের জন্য আদর্শ। মাটির পিএইচ (pH) ৬.৫ থেকে ৭.৫ এর মধ্যে থাকলে এবং ০.৫% – ০.৬% কার্বন থাকলে আখের বৃদ্ধি দ্রুত হয়। গঙ্গেয় পলিমাটির দোআঁশ, লালচে দোআঁশ বা ল্যাটেরাইট মাটিতেও আখ ভালো জন্মায়।
- সময়: আখ রোপণের জন্য শরৎকাল (১৫ সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর) এবং বসন্তকাল (ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ) সবথেকে উপযুক্ত।
৩. আখের বীজতলা ও আধুনিক রোপণ পদ্ধতি
সঠিক আখ চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে রোগবালাই কম হয় এবং ফলন বৃদ্ধি পায়।
- বীজতলা তৈরি: মাটি ভালোভাবে নরম করে প্রতি বর্গমিটারের জন্য ট্রাইকোডার্মা ভিরিডে এবং সিউডোমোনাস ফ্লুরোসেন্স (১:১) ২০ গ্রাম মিশিয়ে শোধন করতে হবে। সার হিসেবে ভার্মি কম্পোস্ট, গোবর সার, ঘোড়ার গোবর এবং পলি ১:১:১:৩:১ অনুপাতে মিশিয়ে বীজতলা তৈরি করলে অসাধারণ ফল পাওয়া যায়।
- ডাবল চারা রোপণ পদ্ধতি: ১০ সপ্তাহ বয়সী চারা প্রথমে গ্রাউন্ড নার্সারিতে ১৫ সেমি দূরত্বে লাগানো হয়। ৪ সপ্তাহ পর সেখান থেকে তুলে মূল জমিতে ৯০ সেমি দূরত্বে লাগালে আখের বৃদ্ধি এবং ওজন অনেক বেশি হয়।
- রোপণের দূরত্ব: ট্রেঞ্চ বা রিং পিট পদ্ধতিতে ৮০ থেকে ৯০ বর্গ সেন্টিমিটার দূরত্বে চারা রোপণ করা উচিত। চারা রোপণের পর মাত্র ৫ সেন্টিমিটার মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
আড়ও দেখুন জি নাইন কলা চাষ পদ্ধতি: আধুনিক টিস্যু কালচার কলার বাণিজ্যিক গাইড
৪. আখ চাষে সঠিক সার ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা
আখের শিকড় মাটির গভীরে (প্রায় ৬০ সেমি) যায়, তাই জমি তৈরির সময় আখ চাষ পদ্ধতি-তে গভীর চাষ দেওয়া আবশ্যক।
- জমি তৈরি: বিঘাপ্রতি অন্তত ২ টন পচা গোবর, ১০০ কেজি রেড়ির খৈল, ৬০ কেজি রক ফসফেট এবং ৬০ কেজি ছাই প্রয়োগ করুন। এছাড়া মাটির উর্বরতা বাড়াতে ৯ কেজি করে অ্যাজোটোব্যাক্টর ও পিএসবি সারের সাথে ৩০০ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে ব্যবহার করা অত্যন্ত কার্যকর।
- ইউরিয়া ও পটাশ: এলাকাভেদে ইউরিয়ার চাহিদা ভিন্ন হয়। মাটির পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ইউরিয়ার এক-তৃতীয়াংশ চাষের সময়, বাকি অংশ কুশি এবং গাছের বৃদ্ধির সময় ভাগ করে দিতে হবে। এছাড়া সালফারের ঘাটতি মেটাতে বিঘাপ্রতি ১০ কেজি সালফার প্রয়োগ করুন।
- ফলন বৃদ্ধিতে হরমোন: আখের লম্বা এবং মোটাসোটা বৃদ্ধির জন্য রোপণের ৯০, ১২০ এবং ১৫০ দিন পর জিবরেলিক অ্যাসিড (35 PPM) এবং ১০০ পিপিএম ইথ্রেল দ্রবণ স্প্রে করলে চমৎকার ফল পাওয়া যায়।
৫. আখ চাষ কতদিন সময় লাগে ও সেচ পদ্ধতি
অনেকেরই প্রশ্ন থাকে আঁখ চাষ কতদিন সময় লাগে। সাধারণত আখের জাত ও রোপণ পদ্ধতি-র ওপর ভিত্তি করে এটি ১০ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত সময় নিতে পারে। এই দীর্ঘ সময়ে জলের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি থাকে।
- সেচের প্রয়োজনীয়তা: ১ টন আখ উৎপাদনে প্রায় ২৫০ টন জলের প্রয়োজন হয়। চারা রোপণের পর থেকে গাছের ২৭১ দিন বয়স পর্যন্ত নিয়মিত বিরতিতে সেচ দিতে হবে।
- ক্রিটিক্যাল পর্যায়: অঙ্কুরোদগম, কুশি আসা এবং মূল বৃদ্ধির সময় জলের অভাব হলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। খরার প্রকোপ কমাতে ২.৫% ইউরিয়া এবং ২.৫% মিউরেট অফ পটাশ ফলিয়ার স্প্রে হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আড়ও দেখুন ড্রাগন ফল চাষ: আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
৬. আগাছা দমন ও আন্তঃফসল চাষ
আখ একটি দীর্ঘ মেয়াদী ফসল হওয়ায় আগাছা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক পদ্ধতিতে আখ চাষ করলে নিন্মের কাজ গুলি অনুসরণীও:
- আগাছানাশক: মেট্রিবুজিন (১.২৫ কেজি/হেক্টর) এবং রোপণের ৭৫ দিন পর অ্যালমিক্স (২০ গ্রাম/হেক্টর) প্রয়োগ করা হাতে আগাছা পরিষ্কারের চেয়ে বেশি সাশ্রয়ী।
- আন্তঃফসল: আখের সারির মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় ঋতু অনুযায়ী গম, সয়াবিন, চিনাবাদাম, সরিষা বা আলু চাষ করা যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, আখের সাথে গম চাষ করলে অতিরিক্ত লাভের পাশাপাশি ঘাসের উপদ্রবও অনেক কম হয়। এছাড়া শুকনো পাতা দিয়ে মালচিং করেও আগাছা দমন করা সম্ভব।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: এক একর জমিতে আখ চাষে কত টাকা লাভ হয়?
উত্তর: আখের জাত এবং বাজারদরের ওপর ভিত্তি করে এক একর জমি থেকে বছরে প্রায় ১.৫ থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিট লাভ করা সম্ভব। আন্তঃফসল (যেমন আলু বা সরিষা) চাষ করলে লাভের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্ন ২: আখ চাষ কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: আখের জাতভেদে এটি সাধারণত ১০ থেকে ১৮ মাস সময় নেয়। তবে অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাত ১২ থেকে ১৪ মাসের মধ্যে কাটার উপযোগী হয়ে যায়।
প্রশ্ন ৩: আখের ফলন বাড়ানোর সহজ উপায় কী?
উত্তর: সঠিক সময়ে কুশি (Tillering) আসার সময় জল সেচ দেওয়া এবং রোপণের পর জিবরেলিক অ্যাসিড ও ইথ্রেল হরমোন প্রয়োগ করলে আখের দৈর্ঘ্য ও ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
তথ্য সূত্র
- ১. ICAR-Sugarcane Breeding Institute (SBI)
- ২. U.P. Council of Sugarcane Research (UPCSR)
- ৩. Department of Agriculture & Farmers Welfare (Govt. of India)
- ৪. Directorate of Agriculture, West Bengal







![বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি: ১টি বস্তায় ৩ কেজি আদা পাওয়ার ৭টি গোপন কৌশল [২০২৬ আপডেট] বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি ও মাটি তৈরির সঠিক নিয়ম - ১টি বস্তায় ৩ কেজি ফলন](https://krishisutra.com/wp-content/uploads/2026/02/bostay-ada-chash-podhati-krishi-sutra-300x169.webp)


