
কম সময়ে বাজারজাত করার মতো সুস্বাদু মাছের মধ্যে অন্যতম হলো ভিয়েতনামী বা মনোসেক্স তেলাপিয়া। এটি দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় একে অনেকে হাইব্রিড তেলাপিয়া মাছও বলে থাকেন। বর্তমানে মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি-তে কৃষকরা আয়ের দিশা দেখছেন।
মনোসেক্স তেলাপিয়া কি এবং কেন চাষ করবেন?
সাধারণ তেলাপিয়া অতি দ্রুত প্রজনন করে পুকুরে মাছের সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলে, যা বাণিজ্যিক চাষে লাভজনক নয়। অন্যদিকে, পুরুষ তেলাপিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাই হ্যাচারিতে সদ্য জন্মানো লার্ভাকে হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে সব মাছকে পুরুষ শ্রেণীতে রূপান্তরিত করা হয়—একে মনোসেক্স তেলাপিয়া বলে।
- বৈশিষ্ট্য: এরা অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল।
- ফলন: মাত্র ৪ থেকে ৫ মাসে মাছে ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজন হয়ে থাকে।
পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতি
হাইব্রিড বা ভিয়েতনামী তেলাপিয়া মাছ চাষ জন্য পদ্ধতিটি কিছুটা আলাদা:
- পুকুর: ৪ থেকে ৬ মাস জল থাকে এমন কম কাদা যুক্ত পুকুর নির্বাচন করুন।
- আয়তন: নার্সারি পুকুর ১৫ ডেসিমেল এবং লালন পুকুর ২০ থেকে ১০০ ডেসিমেল হলে ভালো (প্রয়োজনে ছোট-বড় হতে পারে)।
- শোধন: পুকুর শুকিয়ে অবাঞ্ছিত মাছ ও প্রাণী দূর করতে হবে। অতিরিক্ত কাদা তুলে ফেলতে হবে (তলায় কাদার পরিমাণ ১০.০ – ১৫.০ সেমি রাখা ভালো)।
- মেরামত: পাড় মেরামত করতে হবে এবং ছায়া কমানোর জন্য পাড়ের গাছের ডাল কেটে দিতে হবে।
- চুন ও জল: প্রতি ডেসিমেলে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করে ৩-৪ দিন পর জল ভরতে হবে।
- সার প্রয়োগ: চুন দেওয়ার ৭ দিন পর প্রতি ডেসিমেলে ৬ কেজি গোবর (৩ দিন পচিয়ে), ১০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ৭০ গ্রাম সিঙ্গেল সুপার ফসফেট দিতে হবে।
- পোনা ছাড়ার সময়: সার প্রয়োগের ২-৩ দিন পর জলের অবস্থা বুঝে পোনা ছাড়ুন।
তেলাপিয়া মজুত করার সঠিক ঘনত্ব
হাইব্রিড বা ভিয়েতনামী তেলাপিয়া মাছ চাষের লাভ নির্ভর করে সঠিক সংখ্যায় পোনা মজুত করার ওপর:
- একক চাষ (নার্সারি পুকুর): ০.২০ থেকে ০.২৫ গ্রাম ওজনের (কেজিতে ৫০০০-৬০০০ টি) পোনা প্রতি শতকে ১৫০০ থেকে ২০০০ টি মজুত করা যায়।
- একক চাষ (লালন পুকুর): পোনা ১০-১৫ গ্রাম ওজনের হলে প্রতি শতকে ২৫০ টি সুস্থ পোনা মজুত করা যাবে।
- মিশ্র চাষ: প্রতি শতকে তেলাপিয়া ১০০-১৫০ টি, পাঙ্গাস ১০০-১৫০ টি এবং ৫-৭ টি মাগুর মাছ দিয়ে মিশ্র চাষ করলে কম সময়ে ভালো উৎপাদন পাওয়া যায়।
আড়ও দেখুন বড় মাছ চাষ পদ্ধতি: পুকুর প্রস্তুতি ও হাতে খাদ্য তৈরির নিয়ম
খাবার তালিকা ও প্রয়োগ পদ্ধতি
মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি-তে দুই ভাবে খাবার দেওয়া যায়—সম্পূরক ভাসমান খাদ্য এবং হাতে তৈরি পরিপূরক খাদ্য।
ভাসমান খাবার: নার্সিং পুকুরে ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ এবং পরে লালন পুকুরে ২৫ থেকে ৪০% প্রোটিন সমৃদ্ধ ভাসমান খাবার প্রয়োগ করতে হবে।
হাতে তৈরি তেলাপিয়ার খাদ্য তালিকা
| খাদ্য উপাদান | শতাংশ |
|---|---|
| চালের কুড়া/গমের ভুসি | ৩০% |
| খৈল | ৩৯% |
| ফিশ মিল | ২৫% |
| ময়দা | ৫% |
| ভিটামিন প্রিমিক্স | ১% |
| মোট | ১০০% |
নার্সিং ও খাদ্য প্রয়োগ তালিকা
মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি-তে প্রতি ১ কেজিতে পোনার সংখ্যা অনুসারে দেহ ওজনের কত শতাংশ খাদ্য দেওয়া প্রয়োজন নিচে তালিকায় দেওয়া হল:
| কেজিতে পোনার সংখ্যা | খাদ্য প্রয়োগ দেহ ওজনের | প্রয়োগ মাত্রা সারা দিনে |
|---|---|---|
| ৫০০০ | ১০০% | ৪ বার |
| ৪০০০ | ৭৫% | ৪ বার |
| ৩০০০ | ৫০% | ৩ বার |
| ২০০০ | ৪০% | ৩ বার |
| ১০০০ | ৩৫% | ৩ বার |
লালন করার সময় খাদ্য তালিকা
প্রতি ১ কেজিতে পোনার সংখ্যা অনুসারে দেহ ওজনের কত শতাংশ খাদ্য দেওয়া প্রয়োজন নিচে তালিকায় দেওয়া হল। তালিকায় কেজিতে ৫০ টি তেলাপিয়াতে ৬% পর্যন্ত খাদ্য প্রয়োগ আছে , এর পর কেজিতে ১০ টি করে কমলে ১% করে খাদ্য প্রয়োগ কমাতে হবে।
| কেজিতে পোনার সংখ্যা | খাদ্য প্রয়োগ দেহ ওজনের | প্রয়োগ মাত্রা সারা দিনে |
|---|---|---|
| ১০০ | ১০% | ২ বার |
| ৮০ | ৮% | ২ বার |
| ৬০ | ৭% | ২ বার |
| ৫০ | ৬% | ২ বার |
তেলাপিয়া মাছ চাষে পর্যবেক্ষণ ও পরিচর্যা
মাছ চাষে নিয়মিত তদারকি অত্যন্ত জরুরি। সঠিক ফলন পেতে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হবে:
- বৃদ্ধি ও খাদ্য পর্যবেক্ষণ: প্রতি ৭ থেকে ১০ দিন অন্তর পুকুরে জাল টেনে মাছের বৃদ্ধি পরীক্ষা করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ঠিক করতে হবে।
- খাদ্য প্রয়োগের সতর্কতা: খাবার দেওয়ার ১ ঘণ্টা পর পুকুর পর্যবেক্ষণ করুন। যদি দেখেন খাবার অবশিষ্ট আছে, তবে বুঝতে হবে মাছের কোনো সমস্যা হয়েছে অথবা খাবার বেশি দেওয়া হয়েছে। এমন অবস্থায় দ্রুত খাবারের পরিমাণ কমিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে হবে।
- জলের গুণমান রক্ষা: পোনা ছাড়ার ১ মাস পর থেকে প্রতি শতকে (১ মিটার গভীরতায়) ১০০ গ্রাম হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। তবে চুনের এই পরিমাণ জলের পি এইচ (pH) পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে কম বা বেশি হতে পারে।
- রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ: জলজ পাখি এক পুকুর থেকে অন্য পুকুরে রোগ জীবাণু ছড়ায়। তাই পাখির উপদ্রব বন্ধ করতে পুকুরের ওপর আড়াআড়িভাবে রশি বা সুতো বেঁধে ঝুলিয়ে দিতে হবে।
আড়ও দেখুন মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি: ১৫টি প্রধান রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা
তেলাপিয়া মাছের উৎপাদন ও আয়
একক বা মিশ্র পদ্ধতিতে ভিয়েতনামী বা মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ করলে অত্যন্ত দ্রুত ফলন পাওয়া যায়:
মিশ্র পদ্ধতিতে উৎপাদন
- সময় ও ওজন: মাত্র ৩ থেকে ৪ মাস চাষ করলেই মাছের গড় ওজন ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়।
- মোট উৎপাদন: এই পদ্ধতিতে চাষ করলে একর প্রতি ৩ থেকে ৪ মাসে প্রায় ৫ থেকে ৬ টন মাছ উৎপাদন করা সম্ভব।
একক পদ্ধতিতে উৎপাদন
একক মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি-তে পালন করলে ৩ থেকে ৪ টন উৎপাদন পাওয়া যায়। হাতে তৈরি তেলাপিয়ার খাদ্য তালিকা অনুসারে খাদ্য দিলে খরচও কম হয়।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. মনোসেক্স তেলাপিয়া এবং সাধারণ তেলাপিয়ার মধ্যে পার্থক্য কী?
মনোসেক্স তেলাপিয়া হলো হ্যাচারিতে হরমোন প্রয়োগ করে তৈরি করা শুধু পুরুষ মাছ। সাধারণ তেলাপিয়া পুকুরে দ্রুত বাচ্চা দিয়ে সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলে যা বাণিজ্যিক চাষে লাভজনক নয়, কিন্তু মনোসেক্স বা হাইব্রিড তেলাপিয়া দ্রুত বড় হয় এবং অধিক ফলন দেয়।
২. ভিয়েতনামী তেলাপিয়া মাছ কত দিনে বিক্রির উপযোগী হয়?
ভিয়েতনামী তেলাপিয়া অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল। আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করলে মাত্র ৩ থেকে ৪ মাসে এর গড় ওজন ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম হয় এবং ৫ থেকে ৮ মাসে এটি ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।
৩. হাইব্রিড তেলাপিয়া চাষে পুকুরে প্রতি শতকে কতটি পোনা ছাড়া যায়?
একক চাষের ক্ষেত্রে লালন পুকুরে ১০-১৫ গ্রাম ওজনের সুস্থ পোনা প্রতি শতকে ২৫০টি পর্যন্ত মজুত করা যায়। তবে নার্সারি পুকুরে এই সংখ্যা ১৫০০ থেকে ২০০০টি পর্যন্ত হতে পারে।
৪. মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছের প্রধান খাবার কী?
এই মাছকে প্রধানত ২৫% থেকে ৪০% প্রোটিন সমৃদ্ধ ভাসমান সম্পূরক খাদ্য দিতে হয়। এছাড়া খৈল, কুঁড়া ও ভুসি দিয়ে তৈরি করা হাতে বানানো পরিপূরক খাদ্যও দেওয়া যেতে পারে।
৫. পুকুরে তেলাপিয়া মাছের রোগ প্রতিরোধ করার উপায় কী?
রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রতি মাসে প্রতি শতকে ১০০ গ্রাম চুন প্রয়োগ করে জলের পি এইচ (pH) নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়া জলজ পাখির মাধ্যমে রোগ ছড়ানো বন্ধ করতে পুকুরের ওপর আড়াআড়িভাবে রশি বা জাল বেঁধে দিতে হবে।
তথ্য সূত্র
- মৎস বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
- বাংলাদেশ মৎস গবেষণা কেন্দ্র।










