
মাছ চাষ একটি লাভজনক ব্যবসা হলেও এর সফলতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে পুকুরের জলের গুনাগুণের ওপর। মৎস্য চাষিদের কাছে সবথেকে বড় প্রশ্ন হলো জলের PH কি এবং কেন এটি মাছের বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে? মূলত, মাছ চাষে পি.এইচ (PH) এর গুরুত্ব এতটাই বেশি যে এর সামান্য তারতম্য আপনার পুরো খামারের উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। নিচে আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
জলের PH কি? একটি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
সাধারণভাবে বলতে গেলে, জল একটি মৃদু তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে জলের কিছু অংশ বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন (H+) ও হাইড্রোক্সিল আয়ন (OH−) তৈরি করে। এই হাইড্রোজেন আয়ন ও হাইড্রোক্সিল আয়নের গাঢ়ত্ব বা ঘনত্বকে যে মানদণ্ড দিয়ে প্রকাশ করা হয়, তাকেই বলা হয় পি এইচ (pH)।
জলের PH কি তা মূলত একটি স্কেল যা ০ থেকে ১৪ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্কেল থেকে বোঝা যায় জল অম্লীয় (Acidic) না ক্ষারীয় (Alkaline):
- অম্লীয় জল: যে জলে হাইড্রোজেন আয়নের (H+) পরিমাণ হাইড্রোক্সিল আয়নের (OH−) থেকে বেশি থাকে।
- ক্ষারীয় জল: যে জলে হাইড্রোক্সিল আয়নের (OH−) পরিমাণ হাইড্রোজেন আয়নের (H+) থেকে বেশি থাকে।
- প্রশম জল: বিশুদ্ধ জলের ক্ষেত্রে এই মান হয় ৭। অর্থাৎ এই জলে হাইড্রোজেন ও হাইড্রোক্সিল উভয় আয়নের ঘনত্ব সমান সমান থাকে।
মাছ চাষের পুকুরে জলের PH কি তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি, কারণ এর মান ৭-এর নিচে হলে জল আম্লিক হয় এবং ৭-এর বেশি হলে জল ক্ষারীয় হয়ে যায়।
১. মাছ চাষে পি.এইচ (PH) এর গুরুত্ব ও আদর্শ মাত্রার প্রয়োজনীয়তা
মাছ চাষে জলের গুনাগুন বজায় রাখতে মাছ চাষে PH এর গুরুত্ব অপরিসীম। মাছ সাধারণত সামান্য ক্ষারযুক্ত জলে সবথেকে ভালো বৃদ্ধি পায়।
- অনুকূল মাত্রা: মাছ চাষের জন্য সবথেকে আদর্শ পি এইচ মাত্রা হলো ৭.৫ থেকে ৮.৫।
- বিপজ্জনক পর্যায়: যদি জলের pH ১১-র ওপর চলে যায়, তবে মাছের ফুলকা ও শরীরের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মাছ মারা যেতে পারে।
- খাদ্যগ্রহণ ও বৃদ্ধি: আবার যদি পি এইচ ৪-এর কম হয়, তবে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে মাছের বৃদ্ধি থমকে দাঁড়ায়।
- রোগবালাই: সঠিক পি এইচ না থাকলে মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে মাছ সহজেই বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং পুকুরে মড়ক দেখা দিতে পারে। তাই সফল মৎস্যচাষি হতে হলে মাছ চাষে PH এর গুরুত্ব সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা আবশ্যক।
আড়ও দেখুন মাছের রোগ ও প্রতিকার পদ্ধতি: ১৫টি প্রধান রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা
২. জলের PH এবং দ্রবীভূত কার্বন ডাইঅক্সাইডের গভীর সম্পর্ক
- পুকুরের জলের পি এইচ স্থির থাকে না, এটি কার্বন ডাইঅক্সাইডের ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়।
- জলে মুক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) বাড়লে পি এইচ এর মান কমে যায় (জল আম্লিক হয়)।
- মুক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড কমলে পি এইচ এর মান বাড়ে (জল ক্ষারীয় হয়)।
দিনের বেলা পুকুরের ফাইটোপ্লাঙ্কটন বা সবুজ উদ্ভিদকণা সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া চালায়। এই প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ জল থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ করে, ফলে দুপুরে জলের পি এইচ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু রাত্রিবেলা সালোকসংশ্লেষ বন্ধ থাকে এবং জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের শ্বাসকার্যের ফলে জলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই কারণেই ভোরবেলা জলের পি এইচ সব থেকে কম থাকে। পুকুরে যদি অতিরিক্ত শ্যাওলা বা উদ্ভিদকণা থাকে, তবে দুপুরে পি এইচ মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে মাছের বিপদ ডেকে আনতে পারে। এখানেও মাছ চাষে পি.এইচ (PH) এর গুরুত্ব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
আড়ও দেখুন গলদা চিংড়ি চাষের আধুনিক পদ্ধতি: চারা মজুত থেকে রোগ বালাই দমন
৩. জলের মোট অ্যালকালিনিটি এবং PH-এর ওঠানামা
পুকুরের জলের অ্যালকালিনিটি বা ক্ষারকত্ব হলো একটি বাফার সিস্টেমের মতো যা পি এইচ এর ওঠানামাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- অ্যালকালিনিটি কম থাকলে: যদি জলে অ্যালকালিনিটি খুব কম থাকে, তবে সকাল ও বিকেলের পি এইচ মানের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ভোরে পি এইচ ৬.৫ থাকলেও বিকেলে তা ১০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
- অ্যালকালিনিটি বেশি থাকলে: যদি অ্যালকালিনিটি সঠিক মাত্রায় থাকে, তবে পি এইচ ভোরে ৭.৫ থাকলেও বিকেলে ৯.৫-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ পি এইচ এর বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হয় না, যা মাছের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
মৎস্যচাষিদের মনে রাখা উচিত যে, জলের PH কি তা জানার পাশাপাশি অ্যালকালিনিটি পরীক্ষা করাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৪. জৈব সার ও চুনের প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণ
পুকুরের পি এইচ নিয়ন্ত্রণে জৈব সার ও চুনের ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী।
- জৈব সারের প্রভাব: পুকুরে যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জৈব সার (যেমন গোবর বা পোল্ট্রি লিটার) ব্যবহার করা হয়, তবে পচনের ফলে গ্যাস তৈরি হয়ে জলের পি এইচ কমিয়ে দেয়।
- চুনের প্রভাব: আবার যদি জল বেশি আম্লিক বা অম্লীয় হয়ে পড়ে, তবে চুন প্রয়োগ করলে পি এইচ এর মান দ্রুত বেড়ে যায় এবং জল মাছ চাষের উপযোগী হয়।
তাই পুকুরে সার প্রয়োগের আগে মাছ চাষে PH এর গুরুত্ব মাথায় রেখে চুনের মাত্রা ঠিক করা উচিত।
আড়ও দেখুন বড় মাছ চাষ পদ্ধতি: পুকুর প্রস্তুতি ও হাতে খাদ্য তৈরির নিয়ম
৫. জলের PH মান নির্ণয়ের পদ্ধতি
জলের PH কি তা জানার জন্য পুকুর পাড়েই দুটি পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা যায়:
- ইলেক্ট্রোড পি এইচ মিটার: এটি একটি ডিজিটাল যন্ত্র যা রসায়নাগারে বা উন্নত খামারে ব্যবহৃত হয়। এটি নিখুঁত মান প্রদান করে।
- পি এইচ পেপার (pH Paper): এটি সবথেকে সহজ পদ্ধতি। একটি বিশেষ ধরনের কাগজ জলে ডোবালে তা রঙের পরিবর্তন ঘটায়। সেই রঙের সাথে সরবরাহ করা কালার চার্ট মিলিয়ে নিলেই জলের পি এইচ মান বোঝা যায়।
- পরীক্ষার সঠিক সময়: সঠিক ফলাফল পেতে হলে দিনে দুবার পরীক্ষা করা উচিত। একবার সকালে সূর্য ওঠার আগে (যখন পি এইচ সবথেকে কম থাকে) এবং একবার বিকেলের দিকে (যখন পি এইচ সবথেকে বেশি থাকে)।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, পুকুরে মাছের ভালো ফলন পেতে হলে জলের PH কি এবং এটি কীভাবে কাজ করে তা জানা প্রতিটি চাষির দায়িত্ব। নিয়মিত জল পরীক্ষা এবং মাছ চাষে পি.এইচ (PH) এর গুরুত্ব বুঝে সঠিক সময়ে চুন বা সার প্রয়োগ করলে মাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় এবং রোগের হাত থেকে খামারকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. মাছ চাষের জন্য পুকুরের জলের আদর্শ pH মান কত?
মাছ চাষের জন্য অনুকূল এবং আদর্শ পি এইচ মাত্রা হলো ৭.৫ থেকে ৮.৫। এই মাত্রায় মাছের বৃদ্ধি সবথেকে দ্রুত হয়।
২. পুকুরের জলের pH কমে গেলে (আম্লিক হলে) কী করবেন?
জলের pH কমে গেলে প্রতি শতাংশে ১-২ কেজি চুন (পাথর চুন বা কৃষি চুন) প্রয়োগ করতে হবে। এতে জলের অম্লত্ব দূর হয়ে pH বৃদ্ধি পায়।
৩. পুকুরে pH কেন প্রতিদিন ওঠানামা করে?
দিনের বেলা সালোকসংশ্লেষের ফলে কার্বন ডাইঅক্সাইড কমে যাওয়ায় pH বাড়ে এবং রাতে শ্বাসকার্যের ফলে কার্বন ডাইঅক্সাইড বাড়ায় ভোরে pH কমে যায়।
৪. জলের pH ৪-এর নিচে বা ১১-র উপরে হলে কী হয়?
pH ৪-এর নিচে হলে মাছ খাবার খায় না ও বৃদ্ধি থমকে যায়। আর ১১-র উপরে হলে মাছের ফুলকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মারা যেতে পারে।
৫. pH পরীক্ষা করার সঠিক সময় কোনটি?
সঠিক ফলাফল পেতে দিনে দুবার পরীক্ষা করা উচিত—একবার সূর্য ওঠার আগে এবং একবার বিকেলের দিকে (দুপুর ২টো থেকে ৪টে)।
তথ্য সূত্র
- মৎস বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকার।










