গাছের পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ ও তার প্রতিকার | Plant Nutrient Deficiency Symptoms

গাছের পাতায় হলুদ বা বেগুনি দাগ কেন হয়? নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, জিংকসহ গাছের পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ এবং চেনার সহজ উপায় ও তার সমাধান জানুন
গাছের পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ ও তার প্রতিকার ।

ভুমিকা ও গাছের গোপন ক্ষুধা (Hidden Hunger)

​ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে মাটি ও গাছের সঠিক স্বাস্থ্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় মাঠের ফসল বাহ্যিক দৃষ্টিতে সুস্থ ও স্বাভাবিক মনে হলেও, মাটিতে পুষ্টির ঘাটতির কারণে উদ্ভিদ তার পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতায় পৌঁছাতে পারে না। কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় Hidden Hunger বা গুপ্ত ক্ষুধা। যখন গাছের পুষ্টির অভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে চোখে দৃশ্যমান লক্ষণ ফুটে ওঠে, ততক্ষণে ফসলের ফলন অনেকাংশেই কমে যায়। তাই লাভজনক ও সফল কৃষি উৎপাদনের মূল চাবিকাঠি হলো সময়মতো গাছের পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ শনাক্ত করা এবং মাটিতে বা পাতায় প্রয়োজনীয় সার ও খাদ্য উপাদান প্রয়োগ করা।

​২. পুষ্টি ঘাটতির প্রধান ৫টি দৃশ্যমান ধরন

​গাছে যখন নির্দিষ্ট কোনো সারের বা খাদ্যের অভাব ঘটে, তখন পাতায় ও কাণ্ডে বিশেষ কিছু পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিজনিত লক্ষণসমূহকে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  • ​ক্লোরোসিস (Chlorosis): ক্লোরোফিল তৈরি ব্যাহত হওয়ার কারণে গাছের পাতায় সবুজ রঙ হারিয়ে হালকা সবুজ বা হলুদ বর্ণ ধারণ করা। এটি গাছের পাতা হলুদ হওয়ার কারণ গুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান।
  • ​নেক্রোসিস (Tissue Death): পুষ্টির তীব্র অভাবে গাছের পাতার নির্দিষ্ট অংশ বা টিস্যু পুরোপুরি মরে যাওয়া বা শুকিয়ে যাওয়া।
  • ​বৃদ্ধি স্থবির হওয়া ও রোসেটিং : কাণ্ডের গিট ছোট হয়ে যাওয়া এবং নতুন বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে পাতাগুচ্ছ একসাথে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া।
  • ​অ্যান্থোসাইয়ানিন সঞ্চয়: পাতায় বেগুনি বা লালচে আভা বা রঙের প্রকাশ পাওয়া।
  • ​স্টান্টিং: গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে গাছ খর্বাকৃতি বা ছোট হয়ে থাকা।

আরও দেখুন গাছের খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান: ১৭টি অপরিহার্য মৌলের কাজ ও অভাবজনিত লক্ষণ

​৩. প্রধান পুষ্টি উপাদান ও অভাবজনিত বিস্তারিত লক্ষণ

গাছের প্রধান পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন ফসফরাস পটাশিয়াম অভাব ও লক্ষণ নীচে দেওয়া হল

​৩.১. নাইট্রোজেন (N) এর অভাবের লক্ষণ

​নাইট্রোজেন হলো উদ্ভিদের দৈহিক বৃদ্ধি ও ক্লোরোফিল তৈরির প্রধান কাঁচামাল। মাটিতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি দেখা দিলে ফসলে অত্যন্ত দ্রুত ও স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পায়।

​গাছে নাইট্রোজেনের অভাবের লক্ষণ সমূহ:

  • ​পুরনো পাতা হলুদ হওয়া: নাইট্রোজেন একটি অতি গতিশীল উপাদান। তাই গাছে নাইট্রোজেনের অভাব দেখা দিলে গাছ তার নিচের বয়স্ক ও পুরনো পাতা থেকে খাদ্য টেনে কচি পাতায় পাঠায়। ফলে গাছের নিচের পাতাগুলো প্রথমে হালকা সবুজ ও পরবর্তীতে দ্রুত হলুদ হয়ে যায়। চাষিরা অনেক সময় এটিকে পানির অভাব মনে করেন, তবে এটি মূলত নাইট্রোজেনের ঘাটতি।
  • ​ফায়ারিং : ধান, ভুট্টা, গম ও ওট জাতীয় খাদ্যে এই লক্ষণ বেশি দেখা যায়। ধান বা ভুট্টা গাছের নিচের পাতার ডগা থেকে শুরু করে মাঝখানের শিরা বরাবর ‘V’ আকৃতিতে হলুদ হয়ে শুকিয়ে যেতে থাকে, যাকে কৃষির ভাষায় ‘Firing’ বলে।
  • ​কপাস বা তুলার ক্ষেত্রে: পাতার বোঁটা ও ফল ধারণকারী শাখা কমে যায়। ডালপালা কম বের হয় এবং বোল ছোট ও সংখ্যায় কম হয়।
  • ​লেবু ও ফল জাতীয় গাছে: লেবু গাছের পুরনো পাতা ছোট, পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে হালকা সবুজ থেকে হলুদ বর্ণ ধারণ করে। তীব্র অভাবে প্রচুর পাতা ঝরে যায়।
  • ​সবজি ও অন্যান্য ফসল: শাকসবজিতে গাছের দণ্ড বা কাণ্ড সরু ও শক্ত হয়ে যায় এবং মূল বা শিকড়ের বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।

​৩.২. ফসফরাস (P) এর অভাবের লক্ষণ

​ফসফরাস উদ্ভিদের শিকড় গঠন, ফুল-ফল ধরা এবং শক্তি সঞ্চয়ের জন্য অপরিহার্য। গাছের পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ হিসেবে ফসফরাসের অভাব সহজে আলাদা করা যায় এর বিশেষ রঙের কারণে।

  • ​গাঢ় সবুজ থেকে বেগুনি রঙ ধারণ: সাধারণ অবস্থায় ফসফরাস ঘাটতিযুক্ত গাছ দেখতে অতিরিক্ত গাঢ় সবুজ মনে হয়। কিন্তু পরবর্তীতে নিচের পাতা এবং কান্ডের গায়ে লালচে-বেগুনি ছোপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
  • ​ভুট্টায় লক্ষণ: কচি ভুট্টা গাছের পাতা ও কাণ্ড স্পষ্ট বেগুনি আকার ধারণ করে। গাছের বৃদ্ধি পুরোপুরি থেমে যায়।
  • ​আলু গাছে: আলু গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধিকালীন সময়ে গাছ খর্বাকৃতি হয়। আলুর টিউবারে ভেতর থেকে বাদামী ছোপ বা ফ্লেক তৈরি হয় যা আলুর গুণমান নষ্ট করে।
  • ​তুলা ও ফল গাছ: ফল গাছে কচি ডাল সরু হয় এবং পাতা ওপরের দিকে খাড়া হয়ে থাকে। ফলে ফল দেরিতে পাকে ও আকারে ছোট হয়।

​৩.৩. পটাশিয়াম (K) এর অভাবের লক্ষণ

​পটাশিয়াম গাছকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দেয়, পানির সমতা বজায় রাখে এবং শস্যদানাকে পুষ্ট করে। পটাশিয়ামের অভাব হলে পাতার কিনারা বরাবর বিশেষ লক্ষণ দেখা যায়।

  • ​পাতার কিনারা পুড়ে যাওয়া : পটাশিয়ামের অভাবে বয়স্ক পাতাকিনার চারপাশ বাদামী হয়ে শুকিয়ে যায়, যেন মনে হয় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
  • ​তামাক ও ধান গাছে: তামাক গাছে পাতার শিরার মাঝে মৃত টিস্যুর বাদামী দাগ দেখা দেয়। ধানে পাতায় হলুদ ও বাদামী ফোঁটা তৈরি হয় এবং ধান গাছ সহজে ঢলে পড়ে।
  • ​তুলায় কটন রট : পাতায় প্রথমে হলুদ-সাদা ছোপ ছোপ দাগ পড়ে, পরে পুরো পাতা বাদামী ও তামাটে হয়ে কোঁকড়ে ঝরে পড়ে।

৪. গৌণ পুষ্টি উপাদান ও অভাবজনিত লক্ষণ

​গাছের সঠিক গঠন, টিস্যুর বিকাশ ও শর্করা বিপাকের জন্য ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক খাদ্য উপাদানের পাশাপাশি গাছের পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দিলে এই গৌণ উপাদানগুলোর ভূমিকা পরীক্ষা করা দরকার।

​৪.১. ম্যাগনেসিয়াম (Mg) এর অভাবের লক্ষণ

​ম্যাগনেসিয়াম হলো ক্লোরোফিল অণুর কেন্দ্রবিন্দু। তাই এর ঘাটতি হলে পাতায় শালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বড় বাধা তৈরি হয়।

  • ​শিরার মধ্যবর্তী অংশ হলুদ হওয়া: ম্যাগনেসিয়ামের অভাব প্রথমে গাছের বয়স্ক বা নিচের পাতায় প্রকাশ পায়। পাতার প্রধান শিরাগুলো সবুজ থাকে, কিন্তু শিরাগুলোর মাঝখানের অংশে হলুদ ভাব দেখা দেয়।
  • ​লালচে ও বেগুনি দাগ : তামাক ও তুলার ক্ষেত্রে পাতার ডগা ও কিনারা ভেতরের দিকে গুটিয়ে যায়। তীব্র ঘাটতিতে পাতা হালকা হলুদ থেকে গাঢ় লালচে-বেগুনি রঙ ধারণ করে এবং কিনারার টিস্যু মরে যায়।
  • ​ভুট্টায় স্ট্রিপ বা দাগ: ভুট্টা গাছে সমান্তরাল শিরাগুলোর মাঝে হালকা হলুদ বা সাদাটে স্ট্রিপ বা রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
  • ​আলু গাছে: আলু গাছে আক্রান্ত পাতাগুলো ভঙ্গুর ও শক্ত হয়ে যায় এবং পাতাকিনারা নিচের দিকে মুড়ে যায়।

​৪.২. ক্যালসিয়াম (Ca) এর অভাবের লক্ষণ

​ক্যালসিয়াম উদ্ভিদের কোষপ্রাচীর শক্ত রাখতে ও নতুন কোষ তৈরিতে সাহায্য করে। এটি একটি অচল উপাদান, তাই এর লক্ষণ গাছের কচি পাতা ও ডগায় প্রকাশ পায়।

  • ​অগ্রকঁড়ি মরে যাওয়া: গাছের শীর্ষ মুকুল বা কচি পাতা শুকিয়ে মরে যায়। তামাক ও টমেটো গাছে কচি পাতার ডগা বাঁকা হয়ে বড়শির মতো হয়ে যায়।
  • ​ভুট্টায় পাতার ডগা আঠার মতো লেগে থাকা: কচি পাতা মেলে ধরার সময় ডগাগুলো একটার সাথে আরেকটা আঠার মতো লেগে যায় এবং সঠিকভাবে ফুটতে পারে না।
  • ​ফল ও কান্ডের দুর্বলতা: ফল ও ফুল ঝরে পড়ে, কাণ্ড কাঠের মতো শক্ত হওয়ার ক্ষমতা হারায় এবং গাছের কচি শিকড়গুলো পচে বাদামী হয়ে যায়।

​৫. মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট বা অণুখাদ্যের অভাবজনিত লক্ষণ

​অণুখাদ্য গাছে খুব কম পরিমাণে লাগে, কিন্তু এদের অভাব হলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অণুখাদ্যের অভাবজনিত সমস্যা সঠিকভাবে শনাক্ত করা আধুনিক কৃষির অন্যতম অংশ।

​৫.১. জিংক বা দস্তা (Zn) এর অভাব

​অণুখাদ্যের মধ্যে জিংকের অভাব ধান-ভুট্টা চাষে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

  • ​হোয়াইট বাড : ভুট্টার চারা অবস্থায় কচি পাতাগুলো সবুজ রঙ হারিয়ে সাদা বা হালকা হলুদ হয়ে বের হয়, যাকে ‘White Bud’ রোগ বলা হয়। এটি জিংকের অভাবের সবচেয়ে বড় চেনার উপায়।
  • ​খয়েরি রোগ ও ব্রোঞ্জ রঙ: ধান গাছে রোপণের ২-৩ সপ্তাহ পর নিচের পাতায় বাদামী বা খয়েরি রঙের ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। তামাক ও পাতাকপি জাতীয় ফসলে পাতায় তামাটে বা ব্রোঞ্জ রঙ ছড়িয়ে পড়ে।
  • ​ইন্টারনোড ছোট হওয়া : গাছের গিট বা নোডের দূরত্ব ছোট হয়ে যায়, ফলে পাতাগুলো একসাথে গুচ্ছ আকারে ছোট ছোট থাকে, যাকে ‘Little Leaf’ বলা হয়।

​৫.২. বোরন (B) এর অভাব

​বোরন উদ্ভিদের পরাগায়ন, ফুল-ফল গঠন এবং কোষ বিভাজনে মূল ভূমিকা পালন করে।

  • ​অগ্রমুকুল নষ্ট হওয়া ও কচি পাতা বিকৃতি: বোরনের অভাবে গাছের বৃদ্ধির ডগা বা অগ্রমুকুল মরে যায় এবং পাশ থেকে নতুন দুর্বল ডাল বের হয়। কচি পাতাগুলো খসখসে, মোটা ও ভঙ্গুর হয়ে যায়।
  • ​আলু ও ফুলকপিতে ক্র্যাকিং: বোরনের অভাবে আলুর কন্দ ও ফুলকপির কাণ্ডের ভেতরের অংশ ফাঁপা ও বাদামী হয়ে যায়। ফল ফেটে যায় এবং ফলের স্বাদ নষ্ট হয়।

​৫.৩. ম্যাঙ্গানিজ (Mn) ও লোহা (Fe) এর অভাব

  • ​ম্যাঙ্গানিজ (Mn): ওট বা গমে ‘Grey Speck’ রোগ দেখা যায়। কচি পাতায় ধূসর বা লালচে দাগ পড়ে কিন্তু প্রধান শিরা সবুজ থাকে।
  • ​আয়রন (Fe): সম্পূর্ণ নতুন পাতাগুলো সবুজ হারিয়ে একদম সাদা বা ফ্যাকাশে হলুদ হয়ে যায়। তবে পাতার প্রধান শিরা তখনও সবুজ রেখার মতো চেনা যায়।

​৫.৪. কপার, সালফার ও মলিবডেনাম

  • ​সালফার (S): নতুন পাতাগুলো ফ্যাকাশে হলুদ হয়, তবে পাতার শিরাও হলুদ হয়ে যায়।
  • ​কপার (Cu): ফল গাছের কচি ডগা শুকিয়ে মরে যাওয়া এবং লেবু জাতীয় ফলের গায়ে আঠা বের হওয়া।
  • ​মলিবডেনাম (Mo): ফুলকপি বা পাতাকপির পাতা সরু হয়ে চাবুকের মতো হয়ে যাওয়া।

৬. পাতার পরিবর্তন দেখে অভাব চেনার উপায় (এক নজরে)

​গাছের পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করার জন্য পাতার অবস্থান ও রঙের পরিবর্তন জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে ম্যানুয়াল (Table – B) অনুযায়ী সারণী আকারে লক্ষণগুলো সাজিয়ে দেওয়া হলো:

​৬.১. বয়স্ক বা নিচের পাতায় লক্ষণ প্রকাশিত হওয়া উপাদানসমূহ

উপাদান পাতার রঙের পরিবর্তন ও প্রধান লক্ষণ
নাইট্রোজেন (N)গাছ হালকা সবুজ হয়; বয়স্ক বা নিচের পাতাগুলো দ্রুত হলুদ হয়ে যায়।
ফসফরাস (P)গাছ গাঢ় সবুজ দেখায় এবং পাতায় লালচে-বেগুনি আভা দেখা যায়; পাতা ও গাছ আকারে ছোট থাকে।
পটাশিয়াম (K)বয়স্ক পাতার কিনারা ও ডগা বাদামী হয়ে পুড়ে যাওয়ার মতো শুকিয়ে যায়।
ম্যাগনেসিয়াম (Mg)পুরনো পাতার প্রধান শিরার মধ্যবর্তী অংশ হলুদ হয় এবং পরবর্তীতে কিনারা থেকে ভেতরের দিকে লালচে-বেগুনি রঙ ধারণ করে।
জিংক (Zn)পাতার শিরার মাঝে স্পষ্ট হলুদ ভাব বা ক্লোরোসিস দেখা দেয় এবং পাতায় তামাটে বা ব্রোঞ্জ রঙ স্পষ্ট হয়।

৬.২. কচি বা উপরের পাতায় লক্ষণ (শীর্ষ মুকুল নষ্ট হয়ে যায়)

উপাদানপাতার রঙের পরিবর্তন ও প্রধান লক্ষণ
ক্যালসিয়াম (Ca)নতুন পাতা গজাতে দেরি হয়, কচি পাতার ডগা বাঁকা ও বিকৃত হয়ে মরে যায় ।
বোরন (B)বৃদ্ধির বৃদ্ধির ডগার কাছাকাছি পাতা হলুদ হয়; কচি কুঁড়ি সাদা বা হালকা বাদামী হয়ে মরে মৃত টিস্যুতে পরিণত হয়।

৬.৩. কচি বা উপরের পাতায় লক্ষণ (শীর্ষ মুকুল জীবিত থাকে)

উপাদান পাতার রঙের পরিবর্তন ও প্রধান লক্ষণ
সালফার (S)কচি পাতার শিরাসহ সম্পূর্ণ পাতা ফ্যাকাশে সবুজ থেকে হলুদ বর্ণ ধারণ করে।
লোহা / আয়রন (Fe)নতুন পাতা হলুদ থেকে একদম সাদাটে হয়ে যায়; ডগায় তীব্র ইন্টারভেনাল ক্লোরোসিস দেখা যায়।
ম্যাঙ্গানিজ (Mn)পাতা হলুদ-ধূসর বা লালচে বর্ণ ধারণ করে, তবে শিরাগুলো সবুজ থাকে।
তাম্র / কপার (Cu)কচি পাতা সুষমভাবে ফ্যাকাশে হলুদ হয়; অনেক সময় ক্লোরোসিস ছাড়াই পাতা নেতিয়ে পড়ে ও শুকিয়ে যায়।
মলিবডেনাম (Mo)উপরের পাতা প্রথমে নেতিয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে হলুদ হয়ে যায়।
ক্লোরিন (Cl)কচি পাতা নেতিয়ে পড়ে এবং পাতার কিনারা বরাবর টিস্যু মরে যায়।

৭. গাছের পুষ্টি ঘাটতি দূর করার কার্যকর উপায় ও ব্যবস্থাপনা

​গাছের পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের ফলন বিপর্যয় হতে পারে। নিচে সঠিক প্রতিকার পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো:

  • ​মাটি পরীক্ষা : সার প্রয়োগের পূর্বে মাটি পরীক্ষা করে কোন সারের ঘাটতি রয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
  • ​জৈব সার ও অনুজীব সারের ব্যবহার: রাসায়নিক সারের পাশাপাশি গোবর সার, কম্পোস্ট, জীবামৃত ও ঘন জীবামৃত প্রয়োগ করলে মাটিতে অনুখাদ্য ও গৌণ উপাদানের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
  • ​অণুখাদ্য স্প্রে : জিংক, বোরন বা আয়রনের তীব্র ঘাটতি দেখা দিলে মাটিতে প্রয়োগের পাশাপাশি পাতায় চিলেটেড অণুখাদ্য স্প্রে করলে গাছ দ্রুত তা শোষণ করতে পারে।
  • ​সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক সার প্রয়োগ:​নাইট্রোজেনের অভাবে: ইউরিয়া সার পরিমিত মাত্রায় প্রয়োগ।
  • ​ফসফরাসের অভাবে: ডিএপি (DAP) বা এসএসপি (SSP) প্রয়োগ।
  • ​পটাশিয়ামের অভাবে: এমওপি (MOP) বা পটাশ সার ব্যবহার।
  • ​জিংক ও বোরনের অভাবে: জিংক সালফেট ও বোরাক্স প্রয়োগ।

8.​উপসংহার

​ফসলের কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে হলে গাছকে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং লক্ষণ অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আশা করা যায়, এই গাইডটি অনুসরণ করে আপনি আপনার ফসলের গাছের পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ সহজেই চিনতে পারবেন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে পারবেন।

তথ্য সূত্র

কৃষি ও সমবায় বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত মাটি পরীক্ষা গাইড এবং আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (IRRI) প্রকাশিত ‘A Practical Guide to Nutrient Management’ এর আলোকেও সংকলিত ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top