প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা (PMFBY) ২০২৬: ফর্ম ফিলাপ ও ক্ষতিপূরণের নিয়ম

প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা (PMFBY) আবেদন পদ্ধতি। আবেদনের ও স্ট্যাটাস চেইক অনলাইন লিংক। PMBSY application Process and status check
প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা (PMFBY) আবেদন পদ্ধতি।

আমাদের দেশে চাষবাস সম্পূর্ণভাবে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। অনেক সময় কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ফলানোর পর হঠাৎ বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি বা পোকার আক্রমণে চোখের সামনে সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এইরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকদের চরম আর্থিক ক্ষতি থেকে বাঁচাতে ভারত সরকার একটি দারুণ জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেছে, যার নাম প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা (PMFBY) বা Pradhan Mantri Fasal Bima Yojana.

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি হলো ফসলের সুরক্ষাকবচ। সামান্য কিছু টাকা জমা দিয়ে এই বীমা করে রাখলে, প্রাকৃতিক কারণে ফসল নষ্ট হলে সরকার তার পুরো ক্ষতিপূরণ দেয়।

১. প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা (PMFBY) মূল উদ্দেশ্য

PMFBY প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো দুর্যোগের সময়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করা। এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হলো:

  • আর্থিক নিরাপত্তা: কোনো কারণে ফসল নষ্ট হলে কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ক্ষতিপূরণের টাকা পৌঁছে দেওয়া।
  • চাষে ধারাবাহিকতা রক্ষা: লোকসানের কারণে কৃষকেরা যেন চাষবাস ছেড়ে না দেন এবং পরবর্তী মরসুমে আবার নতুন উদ্যমে চাষ করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা।
  • আধুনিক চাষে উৎসাহ: কৃষকদের আধুনিক ও উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করতে উৎসাহিত করা, কারণ এতে ঝুঁকির ভয় থাকে না।

বিশেষ দ্রষ্টব্য- আপনি যদি PM কিষান নতুন আবেদন ও স্ট্যাটাস চেক করতে চান তো এই লিংকে ক্লিক করুন।

২. কোন কোন ফসলের ওপর বীমা করা যায়?

এই যোজনার অধীনে প্রায় সমস্ত প্রধান ফসলের ওপরই বীমা করার সুবিধা রয়েছে। মরসুম অনুযায়ী সেগুলিকে নিচে ভাগ করে দেওয়া হলো:

  • খরিফ মরসুমের ফসল: আমন ও আউশ ধান, ভুট্টা, পাট, তৈলবীজ এবং বিভিন্ন ধরণের ডালশস্য।
  • রবি মরসুমের ফসল: বোরো ধান, গম, সর্ষে, আলু, মসুর ডাল, তিসি এবং রবি মরসুমের অন্যান্য সবজি।
  • বাণিজ্যিক ও উদ্যানপালন ফসল: বিভিন্ন ধরণের বার্ষিক ফল, পান চাষ, আদা, হলুদ এবং বিশেষ কিছু দামী ফসল।

৩. কৃষকদের কত টাকা প্রিমিয়াম (Premium) দিতে হয়?

বীমা করার জন্য যে টাকা জমা দিতে হয়, তাকে প্রিমিয়াম বলে। সাধারণত বীমার প্রিমিয়াম অনেক বেশি হয়, কিন্তু ফসল বীমা যোজনায় খরচের সিংহভাগ টাকা সরকার নিজে দেয়। কৃষকদের মাত্র নামমাত্র কিছু টাকা দিতে হয়, যার হিসাব নিচে দেওয়া হলো:

  • খরিফ ফসলের জন্য: মোট বীমা রাশির মাত্র ২% (২ টাকা) দিতে হয়। অর্থাৎ, ১০০ টাকার বীমা করতে কৃষক দেবেন মাত্র ২ টাকা, বাকি ৯৮ টাকা দেবে সরকার।
  • রবি ফসলের জন্য: মোট বীমা রাশির মাত্র ১.৫% (১ টাকা ৫০ পয়সা) দিতে হয়।
  • বাণিজ্যিক ও ফল-সবজি চাষের জন্য: বার্ষিক বা উদ্যানপালন ফসলের ক্ষেত্রে প্রিমিয়ামের হার কিছুটা বেশি, যা হলো মোট বীমা রাশির ৫% (৫ টাকা)।

৪. ফসল বীমা করার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও শর্তাবলী

দেশের যেকোনো প্রকৃত চাষি এই যোজনার সুবিধা নিতে পারেন। আবেদনের প্রধান শর্ত ও যোগ্যতাগুলি হলো:

  • নিজস্ব জমির মালিক: যে সমস্ত কৃষকের নিজের নামে চাষের জমি বা খতিয়ান রয়েছে, তাঁরা আবেদন করতে পারবেন।
  • লিজ বা ভাগচাষী: যদি আপনার নিজের জমি না থাকে এবং আপনি অন্য কারও জমি চুক্তিপত্র বা লিজ নিয়ে চাষ করেন, তবে আপনিও এই বীমা পাওয়ার যোগ্য।
  • কেসিসি (KCC) নেওয়া কৃষক: আগে ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া কৃষকদের জন্য এই বীমা বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক (Voluntary)। লোন নেওয়া বা না নেওয়া—সব ধরণের কৃষকই এখন নিজের ইচ্ছামতো এই বীমা করতে বা বাদ দিতে পারেন।

৫. PMFBY আবেদনের জন্য কী কী নথিপত্র লাগে?

ফসল বীমার আবেদন প্রক্রিয়াটি সঠিক ও ঝামেলামুক্ত রাখতে নিচে দেওয়া কাগজপত্রগুলি আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা প্রয়োজন:

  • ১. পরিচয়পত্র : আবেদনকারী কৃষকের আধার কার্ড এবং ভোটার কার্ড।
  • ২. ব্যাংক পাসবই: কৃষকের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পাসবইয়ের প্রথম পাতার জেরক্স (যেখানে অ্যাকাউন্ট নম্বর ও IFSC কোড পরিষ্কার দেখা যায়)। ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি অবশ্যই সচল এবং আধার লিঙ্কড হতে হবে।
  • ৩. জমির নথিপত্র: চাষের জমির সাম্প্রতিক খতিয়ান, পর্চা বা দলিলের কপি।
  • ৪. ফসল রোপণের শংসাপত্র: কৃষক ওই জমিতে নির্দিষ্ট ফসলটি বুনেছেন বা রোপণ করেছেন, তার একটি প্রমাণপত্র। এটি সাধারণত স্থানীয় কৃষি আধিকারিক ( KPS) বা গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানের কাছ থেকে সার্টিফাই করিয়ে নিতে হয়।
  • ৫. ভাগচাষীদের ক্ষেত্রে চুক্তিপত্র: নিজস্ব জমি না থাকলে জমির আসল মালিকের সাথে করা লিজ বা ভাগচাষের চুক্তিপত্র জমা দিতে হবে।

৬. PMFBY ফর্ম ফিলাপ কিভাবে করবেন?

ফসল বীমার আবেদন মূলত দুইভাবে করা যায়—অনলাইন এবং অফলাইন। কৃষকেরা তাঁদের সুবিধামতো যেকোনো একটি মাধ্যম বেছে নিতে পারেন:

ক) অফলাইন আবেদন পদ্ধতি:

  • আপনার নিকটবর্তী কমার্শিয়াল ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক বা সমবায় সমিতি -তে গিয়ে ফসল বীমার ফর্ম তুলতে পারেন।
  • এছাড়া আপনার ব্লকের সহ-কৃষি অধিকর্তার (ADA) অফিসে বা স্থানীয় সহজ তথ্য মিত্র কেন্দ্রে গিয়ে ফর্ম জমা দেওয়া যায়।

খ) প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা ২০২৬ আবেদন অনলাইন পদ্ধতি

আপনি নিজেই সরাসরি প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনার অফিশিয়াল পোর্টাল আবেদন করতে নিচের নীল বটম টি তে ক্লিক করুন।

ধাপে ধাপে নির্দেশিকা

  • ধাপ ১: উপরের লিংকে ক্লিক করে অফিসিয়াল পোর্টালে যান এবং ‘Farmer Corner’-এ টাচ করুন।
  • ধাপ ২: নতুন হলে ‘Guest Farmer’ হিসেবে নিজের নাম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে রেজিস্টার করুন।
  • ধাপ ৩: বর্তমান মরশুম, বছর এবং আপনার ফসলের নাম সিলেক্ট করুন।
  • ধাপ ৪: আপনার ব্লক, মৌজা এবং জমির খতিয়ান/দাগ নম্বর ইনপুট করুন।
  • ধাপ ৫: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস (যেমন- পরিচয়পত্র, ব্যাংক পাসবই এবং জমির পর্চা) আপলোড করে সামান্য প্রিমিয়াম অনলাইনে জমা দিন এবং রসিদটি প্রিন্ট করে রাখুন।

বিশেষ সতর্কবার্তা: প্রতিটি ফসলের বীমা করার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা লাস্ট ডেট (Deadline) থাকে। সাধারণত খরিফ ফসলের জন্য জুলাই-আগস্ট এবং রবি ফসলের জন্য ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসের মধ্যে আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। তাই সঠিক সময়ে কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা জরুরি।

আড়ও দেখুন: কৃষাণ ক্রেডিট কার্ড (KCC) কিভাবে করবেন ও ব্যাংক কিভাবে ঋণ পরিকল্পনা করে জানতে ক্লিক করুন।

৭. প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা (PMFBY) স্ট্যাটাস চেক পদ্ধতি

ভারতের অন্যান্য রাজ্যের কৃষকেরা যারা কেন্দ্রীয় পোর্টালে আবেদন করেছেন, তারা নিচের পদক্ষেপে স্ট্যাটাস দেখতে পাবেন। PMFBY-এর অফিসিয়াল পোর্টালে প্রবেশ করতে নিচের বটম এ ক্লিক করুন।

  • ধাপ ১: প্রথমে PMFBY-এর অফিসিয়াল পোর্টালে (pmfby.gov.in) প্রবেশ করুন।
  • ধাপ ১: হোমপেজের মেনুবার থেকে “Application Status” অপশনটিতে ক্লিক করুন।
  • ধাপ ২: এবার আপনার আবেদনের সময় পাওয়া ‘Receipt Number’ বা ‘Application Number’ টি নির্দিষ্ট ঘরে বসান।
  • ধাপ ৩: স্ক্রিনে দেখানো ক্যাপচা কোডটি (Captcha) সঠিকভাবে টাইপ করুন।
  • ধাপ ৪: সবশেষে “Check Status” বোতামে ক্লিক করলেই আপনার বিমাটি কোন পর্যায়ে আছে (যেমন- Approved, Rejected বা Pending) তা দেখতে পাবেন।

৮. ফসল নষ্ট হলে টাকা পাওয়ার নিয়ম ও সময়সীমা

অনেকেই মনে করেন বীমা করলেই টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু ফসল নষ্ট হওয়ার পর সঠিক নিয়মটি না মানলে ক্ষতিপূরণ আটকে যেতে পারে। টাকা পাওয়ার আসল নিয়মটি নিচে দেওয়া হলো:

  • ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অবগতি: বন্যা, শিলাবৃষ্টি বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে যদি আপনার মাঠের ফসল নষ্ট হয়, তবে ক্ষতি হওয়ার ঠিক ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আপনাকে বীমা কোম্পানি, স্থানীয় কৃষি অফিস অথবা টোল-ফ্রি নম্বরে ফোন করে জানাতে হবে। দেরি করলে দাবি বা ক্লেইম খারিজ হতে পারে।
  • মাঠ পরিদর্শন: আপনার অভিযোগ পাওয়ার পর বীমা কোম্পানির প্রতিনিধি এবং সরকারি কৃষি দপ্তরের অফিসাররা যৌথভাবে আপনার জমিতে এসে ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখবেন এবং ছবি তুলবেন।
  • ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ: এছাড়া পুরো এলাকার গড় ফলন দেখার জন্য ‘ক্রপ কাটিং এক্সপেরিমেন্ট’-এর সাহায্য নেওয়া হয়। যদি দেখা যায় প্রাকৃতিক কারণে ওই এলাকার ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তবে বীমা পাস করা হয়।
  • ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT): সমস্ত ভেরিফিকেশন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর, সরকার এবং বীমা কোম্পানির তরফ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা সরাসরি কৃষকের রেজিস্টার্ড ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

আড়ও দেখুন – আপনি কি কৃষি পরিকাঠামো এর জন্য ঋণ নিতে চাচ্ছেন? ২ কোটি টাকা পযন্ত ঋন জানতে ক্লিক করুন।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন: ব্যাংক থেকে কেসিসি (KCC) লোন নেওয়া থাকলে কি ফসল বীমা করা বাধ্যতামূলক?

উত্তর: না, এখন আর বাধ্যতামূলক নয়। আগে এটি অটোমেটিক কেটে নেওয়া হতো, কিন্তু বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। লোন নেওয়া কৃষকেরা যদি বীমা করতে না চান, তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাংককে লিখিতভাবে জানাতে হবে।

প্রশ্ন: খরা বা বন্যা ছাড়াও কি ফসল কাটার পর মাঠে থাকা ফসলের ক্ষতিপূরণ মেলে?

উত্তর: হ্যাঁ, মেলে। ফসল কাটার পর জমিতে শুকোতে দেওয়া হয়েছে এমন ফসল যদি পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে কোনো ঘূর্ণিঝড়, শিলাবৃষ্টি বা অসময়ের বৃষ্টিতে নষ্ট হয়, তবে তার জন্যও এই যোজনার অধীনে ‘Post-Harvest Loss’ বা ফসল কাটার পরবর্তী ক্ষতির ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়।

Spread the love

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top